ভালোবাসার শেষ ঠিকানা
-
Reporter Name - Update Time : ১০:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
- ১ Time View

ইয়াসমিন আক্তার
বর্তমান সময়ে ভালোবাসা যেন খুব সহজেই শুরু হয়, অথচ শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসাকে ধরে রাখার মানুষ খুঁজে পাওয়া বড় কঠিন।
মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে নীলার সঙ্গে পরিচয় হয় আরিয়ানের। ফেসবুকে একটি ছোট্ট মন্তব্য থেকে শুরু, তারপর মেসেঞ্জারে কথা, গভীর রাতে ফোনে গল্প—এভাবেই দুজনের অজান্তে জন্ম নেয় ভালোবাসা।
আরিয়ান প্রায়ই বলত,
— নীলা, একদিন তোমাকে নিজের ঘরে নিয়ে যাব। আমাদের ছোট্ট একটা সংসার হবে। তুমি রান্না করবে, আমি অফিস থেকে ফিরে তোমার অপেক্ষায় থাকব।
নীলা হেসে বলত,
— কথা দাও, কখনো বদলে যাবে না তো?
আরিয়ান উত্তর দিত,
— মানুষ বদলাতে পারে, কিন্তু তোমার জন্য আমার ভালোবাসা কখনো বদলাবে না।
সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। একে অপরকে ছাড়া দিন কাটানো কঠিন হয়ে পড়ল। কিন্তু বাস্তবতা যে কল্পনার মতো সুন্দর নয়, তা বুঝতে তাদের বেশি দিন লাগল না।
আরিয়ানের পরিবার তার জন্য ধনী ঘরের মেয়ে পছন্দ করল। পরিবারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তার ছিল না। অন্যদিকে নীলা প্রতিদিন অপেক্ষা করত আরিয়ানের একটি ফোনের জন্য। যে মানুষটি একসময় তার চোখের পানি সহ্য করতে পারত না, সেই মানুষটিই এখন তার কান্নার কারণ।
একদিন নীলা ফোন করে বলল, — আরিয়ান, তুমি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছ?
ওপাশ থেকে দীর্ঘ নীরবতার পর উত্তর এল, — নীলা, আমাকে ক্ষমা করে দিও। পরিবারের বিরুদ্ধে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
নীলার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল। কাঁপা কণ্ঠে বলল, — তাহলে এত স্বপ্ন দেখালে কেন? ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে একবারও ভাবলে না, তোমাকে হারালে আমার কী হবে?
আরিয়ান কোনো উত্তর দিতে পারল না। সেদিনই তাদের সম্পর্কের শেষ কথা হয়ে গেল।
কয়েক মাস পর আরিয়ানের বিয়ে হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিয়ের ছবি দেখে নীলা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। ছবিতে আরিয়ানের মুখে হাসি, পাশে তার নতুন জীবনসঙ্গী। অথচ এই মানুষটিই একদিন নীলাকে বলেছিল, তার পৃথিবীজুড়ে শুধু নীলা।
নীলা নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে দিল না। আবার পড়াশোনায় মন দিল, চাকরির জন্য চেষ্টা করল। ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিল। কিন্তু কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলো ভুলে যাওয়া যায় না—শুধু বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখতে হয়।
তিন বছর পর এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে হঠাৎ আরিয়ানের সঙ্গে দেখা হলো একটি হাসপাতালের সামনে। আরিয়ান তখন স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিল। নীলাকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল।
— কেমন আছ, নীলা?
নীলা মৃদু হেসে বলল, — ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?
— ভালো। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি অনেক বদলে গেছ।
নীলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, — মানুষ বদলায় না, আরিয়ান। সময় তাকে বদলে যেতে শেখায়। যে মেয়েটি একদিন তোমার একটা ফোনের জন্য সারারাত কাঁদত, সে আজ নিজের চোখের পানি নিজেই মুছতে শিখেছে।
আরিয়ান মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল, — আমাকে কি কখনো ক্ষমা করতে পারবে?
নীলা উত্তর দিল, — ক্ষমা করেছি। কিন্তু ক্ষমা করা আর ফিরে যাওয়া এক কথা নয়। তুমি আমার জীবনের একটি সুন্দর অধ্যায় ছিলে, আর সেই অধ্যায়ের শেষটা ছিল খুব কষ্টের। আমি আর সেই গল্পে ফিরতে চাই না।
কথা শেষ করে নীলা চলে গেল। আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে পড়ল, একদিন এই মেয়েটিই তার সঙ্গে সারাজীবন থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।
কিন্তু আজ সেই স্বপ্নের মানুষটি তার পাশ দিয়ে চলে গেল, একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আরিয়ানের মুখে পড়ছিল। সে বুঝতে পারল না, সেগুলো বৃষ্টির পানি, নাকি নিজের চোখের জল।
জীবনে কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। কেউ প্রিয় মানুষটিকে পেয়েও হারায়, কেউ হারিয়েও তাকে ভালোবেসে যায়। আর কেউ কেউ সময়ের সঙ্গে শিখে নেয়—ভালোবাসা মানেই কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়, কখনো কখনো ভালোবাসা মানে নিজের হৃদয় ভেঙে গেলেও প্রিয় মানুষটির স্মৃতি থেকে মুক্ত হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

















