Hi

ঢাকা ১১:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের পথে একা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩৪:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ৬ Time View

ইয়াসমিন আক্তার
স্বপ্নটা বড় অদ্ভুত ছিল,
কত কিছু করার ইচ্ছে ছিল,
কত দূর যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল—
কিন্তু পরিবেশ, পরিস্থিতি আর বাস্তবতার সঙ্গে
সেই স্বপ্নগুলো কোনোদিন ঠিকমতো মিলিয়ে উঠতে পারিনি।
ভেবেছিলাম,
যে মানুষটি একদিন আমার জীবনসঙ্গী হবে,
সে হয়তো আমার পথচলার সঙ্গী হবে,
কঠিন সময়ে হাতটা শক্ত করে ধরবে,
আমার স্বপ্নগুলোকে নিজের স্বপ্ন মনে করে
একটু এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
কিন্তু হলো না।
বরং কখনো কখনো মনে হয়েছে,
আমার সামান্য সফলতাতেও
সেই মানুষটির চোখে আনন্দের চেয়ে
হিংসার ছায়াটাই বেশি ছিল।
আমার পথটা সহজ করার মতো
একটি হাতও বাড়িয়ে দেয়নি সে।
পড়াশোনার জীবনে ভেবেছিলাম,
সবচেয়ে কাছের যে বন্ধুটি,
সে হয়তো আমার পাশে থাকবে।
কঠিন কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে
একটু বুঝিয়ে দেবে,
প্রয়োজন হলে নোট দেবে,
কোনো বিপদে পড়লে
একটা ভালো পরামর্শ দেবে।
কিন্তু সেখানেও
আমার প্রত্যাশাগুলো অপূর্ণই রয়ে গেল।
তারপর ভেবেছিলাম,
যে পরিবারে সারা জীবন কাটাব,
সেই পরিবার, আত্মীয়স্বজন—
হয়তো আমার সফলতার পথে
কেউ না কেউ একটু পাশে দাঁড়াবে।
হয়তো বলবে,
“তুমি এগিয়ে যাও, আমরা আছি।”
কিন্তু না,
সেখানেও কেউ ছিল না।
আমার সাফল্যের গল্পে
অনেকেই ফল পেতে চেয়েছে,
কিন্তু সেই ফলের গাছটাকে
বাঁচিয়ে রাখার জন্য
কেউ এক ফোঁটা জলও দিতে চায়নি।
বাবার একটা স্বপ্ন ছিল—
আমি জীবনে অনেক বড় হব।
তাঁর সেই স্বপ্নটা
আজও আমার বুকের ভেতর বেঁচে আছে।
কিন্তু আমি জানি,
তাঁর স্বপ্নের মতো করে
সবকিছু পূরণ করতে পারিনি।
তবুও আমার ছোট্ট কোনো সাফল্যে
সবচেয়ে বেশি খুশি হতো মা।
আর কেউ নয়—
শুধু মা।
আমার সাফল্যের ফল
অনেকে ভোগ করতে চেয়েছে,
কিন্তু মা কখনো কোনো ফল চায়নি।
মা শুধু চেয়েছে,
আমি যেন ভালো থাকি।
আমার মুখে হাসি থাকুক,
আমার জীবনে শান্তি থাকুক—
এর বেশি মায়ের কোনো চাওয়া ছিল না।
আর বাবা?
বাবা ছিলেন আমার সেই ছায়াসঙ্গী,
যাঁর মতো নিঃস্বার্থ মানুষ
জীবনে দ্বিতীয়বার পাইনি।
ক্লাস শেষ করে ফিরতে একটু দেরি হলে
বাবা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
আমি কখন ফিরব,
কোন পথে ফিরব,
নিরাপদে ফিরব কি না—
সেই অপেক্ষায়।
তখন হয়তো বুঝিনি,
একজন বাবা কতটা ভালোবাসলে
সন্তানের ফেরার পথের দিকে
এভাবে তাকিয়ে থাকতে পারেন।
আজ বুঝি।
আজ কোনো বাড়িতে গেলে,
কোনো দরজার সামনে দাঁড়ালে,
অচেনা কোনো উঠোনে পা রাখলে
হঠাৎ মনে হয়—
বাবা বুঝি এখানেই দাঁড়িয়ে আছেন,
আমার অপেক্ষায়।
তারপর মনে পড়ে—
বাবা তো আর এই পৃথিবীতে নেই।
এই অনুভূতিটা কাউকে বোঝানো যায় না।
বাবাকে হারানোর শূন্যতা
শুধু নিজের ভেতরেই অনুভব করতে হয়।
আজ জীবনের প্রতিটি সফলতার পথে
মনে হয়, আমাকে যুদ্ধ করেই এগোতে হয়।
একটি ছোট্ট সাফল্যের জন্যও
কত বাধা পেরোতে হয়,
কত মানুষের অবহেলা সহ্য করতে হয়,
কতবার নিজের চোখের জল
নিজেকেই মুছে ফেলতে হয়।
অথচ একসময় আমি ছিলাম বাবার রাজকন্যা।
তখন পৃথিবী একদিকে,
আর আমার কাজ একদিকে।
আমার কোনো কাজ কঠিন হলে
বাবা-মা নিজেদের হাজার কষ্ট ভুলে
চাইতেন, কাজটা যেন আমার হয়ে যায়।
আমার পথের কাঁটা সরিয়ে
তাঁরা নিজেরাই কাঁটার ওপর হাঁটতেন।
তখন বুঝিনি—
সেটাই ছিল ভালোবাসা।
সেটাই ছিল নিরাপদ আশ্রয়।
সেটাই ছিল এমন এক পৃথিবী,
যেখানে আমার স্বপ্ন পূরণ হওয়াটাই
ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
আজ সেই পৃথিবীটা নেই।
বাবা নেই,
সেই ছায়াটা নেই,
সেই অপেক্ষা নেই,
কেউ আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলে না—
“এত দেরি হলো কেন?”
তবুও আমি হাঁটি।
হয়তো ধীরে,
হয়তো বারবার হেরে গিয়ে,
হয়তো চোখের জল লুকিয়ে—
তবুও হাঁটি।
কারণ কোথাও একজন বাবা
হয়তো এখনো তাঁর রাজকন্যার জন্য
অপেক্ষা করছেন।
আর একজন মা
আজও কোনো সাফল্যের ভাগ চান না,
শুধু চান—
তাঁর মেয়েটা ভালো থাকুক।
তাই স্বপ্নটা এখনো মরে যায়নি।
শুধু স্বপ্নের পথে
সঙ্গী কমে গেছে।
আগে বাবা-মা
আমার পথের পাশে হাঁটতেন,
আজ তাঁদের স্মৃতিই
আমার পথের আলো।
হয়তো একদিন
সত্যিই অনেক বড় কিছু হতে পারব।
সেদিন সাফল্যের ভিড়ে দাঁড়িয়ে
সবার আগে শুধু এটুকুই বলব—
“বাবা, তোমার রাজকন্যা
হয়তো তোমার স্বপ্নের মতো হতে পারেনি,
কিন্তু তোমার শেখানো সাহসটা
আজও হারায়নি।”

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

স্বপ্নের পথে একা

Update Time : ১০:৩৪:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ইয়াসমিন আক্তার
স্বপ্নটা বড় অদ্ভুত ছিল,
কত কিছু করার ইচ্ছে ছিল,
কত দূর যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল—
কিন্তু পরিবেশ, পরিস্থিতি আর বাস্তবতার সঙ্গে
সেই স্বপ্নগুলো কোনোদিন ঠিকমতো মিলিয়ে উঠতে পারিনি।
ভেবেছিলাম,
যে মানুষটি একদিন আমার জীবনসঙ্গী হবে,
সে হয়তো আমার পথচলার সঙ্গী হবে,
কঠিন সময়ে হাতটা শক্ত করে ধরবে,
আমার স্বপ্নগুলোকে নিজের স্বপ্ন মনে করে
একটু এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
কিন্তু হলো না।
বরং কখনো কখনো মনে হয়েছে,
আমার সামান্য সফলতাতেও
সেই মানুষটির চোখে আনন্দের চেয়ে
হিংসার ছায়াটাই বেশি ছিল।
আমার পথটা সহজ করার মতো
একটি হাতও বাড়িয়ে দেয়নি সে।
পড়াশোনার জীবনে ভেবেছিলাম,
সবচেয়ে কাছের যে বন্ধুটি,
সে হয়তো আমার পাশে থাকবে।
কঠিন কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে
একটু বুঝিয়ে দেবে,
প্রয়োজন হলে নোট দেবে,
কোনো বিপদে পড়লে
একটা ভালো পরামর্শ দেবে।
কিন্তু সেখানেও
আমার প্রত্যাশাগুলো অপূর্ণই রয়ে গেল।
তারপর ভেবেছিলাম,
যে পরিবারে সারা জীবন কাটাব,
সেই পরিবার, আত্মীয়স্বজন—
হয়তো আমার সফলতার পথে
কেউ না কেউ একটু পাশে দাঁড়াবে।
হয়তো বলবে,
“তুমি এগিয়ে যাও, আমরা আছি।”
কিন্তু না,
সেখানেও কেউ ছিল না।
আমার সাফল্যের গল্পে
অনেকেই ফল পেতে চেয়েছে,
কিন্তু সেই ফলের গাছটাকে
বাঁচিয়ে রাখার জন্য
কেউ এক ফোঁটা জলও দিতে চায়নি।
বাবার একটা স্বপ্ন ছিল—
আমি জীবনে অনেক বড় হব।
তাঁর সেই স্বপ্নটা
আজও আমার বুকের ভেতর বেঁচে আছে।
কিন্তু আমি জানি,
তাঁর স্বপ্নের মতো করে
সবকিছু পূরণ করতে পারিনি।
তবুও আমার ছোট্ট কোনো সাফল্যে
সবচেয়ে বেশি খুশি হতো মা।
আর কেউ নয়—
শুধু মা।
আমার সাফল্যের ফল
অনেকে ভোগ করতে চেয়েছে,
কিন্তু মা কখনো কোনো ফল চায়নি।
মা শুধু চেয়েছে,
আমি যেন ভালো থাকি।
আমার মুখে হাসি থাকুক,
আমার জীবনে শান্তি থাকুক—
এর বেশি মায়ের কোনো চাওয়া ছিল না।
আর বাবা?
বাবা ছিলেন আমার সেই ছায়াসঙ্গী,
যাঁর মতো নিঃস্বার্থ মানুষ
জীবনে দ্বিতীয়বার পাইনি।
ক্লাস শেষ করে ফিরতে একটু দেরি হলে
বাবা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
আমি কখন ফিরব,
কোন পথে ফিরব,
নিরাপদে ফিরব কি না—
সেই অপেক্ষায়।
তখন হয়তো বুঝিনি,
একজন বাবা কতটা ভালোবাসলে
সন্তানের ফেরার পথের দিকে
এভাবে তাকিয়ে থাকতে পারেন।
আজ বুঝি।
আজ কোনো বাড়িতে গেলে,
কোনো দরজার সামনে দাঁড়ালে,
অচেনা কোনো উঠোনে পা রাখলে
হঠাৎ মনে হয়—
বাবা বুঝি এখানেই দাঁড়িয়ে আছেন,
আমার অপেক্ষায়।
তারপর মনে পড়ে—
বাবা তো আর এই পৃথিবীতে নেই।
এই অনুভূতিটা কাউকে বোঝানো যায় না।
বাবাকে হারানোর শূন্যতা
শুধু নিজের ভেতরেই অনুভব করতে হয়।
আজ জীবনের প্রতিটি সফলতার পথে
মনে হয়, আমাকে যুদ্ধ করেই এগোতে হয়।
একটি ছোট্ট সাফল্যের জন্যও
কত বাধা পেরোতে হয়,
কত মানুষের অবহেলা সহ্য করতে হয়,
কতবার নিজের চোখের জল
নিজেকেই মুছে ফেলতে হয়।
অথচ একসময় আমি ছিলাম বাবার রাজকন্যা।
তখন পৃথিবী একদিকে,
আর আমার কাজ একদিকে।
আমার কোনো কাজ কঠিন হলে
বাবা-মা নিজেদের হাজার কষ্ট ভুলে
চাইতেন, কাজটা যেন আমার হয়ে যায়।
আমার পথের কাঁটা সরিয়ে
তাঁরা নিজেরাই কাঁটার ওপর হাঁটতেন।
তখন বুঝিনি—
সেটাই ছিল ভালোবাসা।
সেটাই ছিল নিরাপদ আশ্রয়।
সেটাই ছিল এমন এক পৃথিবী,
যেখানে আমার স্বপ্ন পূরণ হওয়াটাই
ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
আজ সেই পৃথিবীটা নেই।
বাবা নেই,
সেই ছায়াটা নেই,
সেই অপেক্ষা নেই,
কেউ আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলে না—
“এত দেরি হলো কেন?”
তবুও আমি হাঁটি।
হয়তো ধীরে,
হয়তো বারবার হেরে গিয়ে,
হয়তো চোখের জল লুকিয়ে—
তবুও হাঁটি।
কারণ কোথাও একজন বাবা
হয়তো এখনো তাঁর রাজকন্যার জন্য
অপেক্ষা করছেন।
আর একজন মা
আজও কোনো সাফল্যের ভাগ চান না,
শুধু চান—
তাঁর মেয়েটা ভালো থাকুক।
তাই স্বপ্নটা এখনো মরে যায়নি।
শুধু স্বপ্নের পথে
সঙ্গী কমে গেছে।
আগে বাবা-মা
আমার পথের পাশে হাঁটতেন,
আজ তাঁদের স্মৃতিই
আমার পথের আলো।
হয়তো একদিন
সত্যিই অনেক বড় কিছু হতে পারব।
সেদিন সাফল্যের ভিড়ে দাঁড়িয়ে
সবার আগে শুধু এটুকুই বলব—
“বাবা, তোমার রাজকন্যা
হয়তো তোমার স্বপ্নের মতো হতে পারেনি,
কিন্তু তোমার শেখানো সাহসটা
আজও হারায়নি।”