Hi

ঢাকা ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুকুরপাড়ের সেই ভালোবাসা

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩১:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ২ Time View

 ইয়াসমিন আক্তার
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর প্রতিদিন পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম—শুধু এক নজর আকাশকে দেখব বলে।
আকাশ…
ছেলেটার মুখটা ছিল ভীষণ মায়াবী। আমার পুকুরপাড় ধরেই প্রায়ই হাঁটত। ওকে দেখলেই বুঝতে পারতাম, আমাকে ওর ভালো লাগে। কিন্তু আকাশ ছিল অসম্ভব লাজুক। জীবনে কখনো মুখ ফুটে একটা কথাও বলতে পারেনি।
তবুও ওর চোখ দুটো যেন সব কথা বলে দিত।
আমি কোথাও বেড়াতে গেলে, কয়েকদিন পর যখন বাড়ি ফিরতাম, দূর থেকেই আকাশের চোখে একটা অভিমান দেখতে পেতাম। মনে হতো, ওর চোখ দুটো যেন বলছে—
“তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে এতদিন?”
এভাবেই নীরবে আমাদের ভালো লাগার দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।
একবার নানুর বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। নদীর ধারে নানুর বাড়ি। ভেবেছিলাম কয়েকদিন থেকেই ফিরে আসব। কিন্তু দেখতে দেখতে পাঁচ দিন হয়ে গেল।
পঞ্চম দিনের বিকেলে নানুর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি—আকাশ দাঁড়িয়ে আছে!
ওর চোখে ভীষণ অভিমান।
আমি বুঝতে পারছিলাম না, ওর সঙ্গে কথা বলব কি না। ঠিক তখনই আকাশ আমাকে ডাকল—
—“তিথি, শুন!”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই প্রথম আকাশের মুখে নিজের নাম শুনলাম।
—“আরে আকাশ! তুমি এখানে কেন?”
আমি ওকে ভেতরে নিয়ে গেলাম।
আমার মামাতো বোন আকাশকে দেখে যেন একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। তখনই বুঝলাম, সে আকাশকে পছন্দ করে ফেলেছে।
কিন্তু আকাশের চোখের সেই অভিমান আমার চোখ এড়াল না।
একপর্যায়ে আকাশ আমাকে বলল—
—“এসেছ বেড়াতে, এতদিন থাকতে হয়?”
আমি মুচকি হেসেছিলাম।
আকাশ কখনো আমাকে বলেনি, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কিন্তু সেদিন আর কোনো সন্দেহ ছিল না।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম—আকাশ আমাকে ভালোবাসে।
সেদিনই আমি আকাশের সঙ্গে নানুর বাড়ি থেকে ফিরে এলাম। নদীর ধারের সেই পথ ধরে দুজন পাশাপাশি হাঁটছিলাম। চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ অন্যরকম সুন্দর হয়ে উঠেছিল।
আমাদের ভালোবাসা তখনও কারও কাছে প্রকাশ পায়নি। অথচ দুজনেই দুজনের মনের কথা জানতাম।
পড়াশোনা, দেখা হওয়ার অপেক্ষা, পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা—সবকিছু মিলিয়ে দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিল।
তারপর এলো এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের দিন।
আমার হাত কাঁপছিল। টেনশনে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
অবশেষে ফলাফল প্রকাশ হলো।
আকাশ গোল্ডেন A+ পেয়েছে।
আকাশের মা আনন্দে যেন পাড়া মাথায় তুলে ফেললেন। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও আমাকে নিয়ে দু-একটা কথা বললেন, যা আমার মনটা ভীষণ খারাপ করে দিল।
আমার ফলাফলও ভালো হয়েছিল। কিন্তু তখন থেকেই মনে হলো, আমাদের সামনে হয়তো কঠিন একটা পথ অপেক্ষা করছে।
আকাশ ভর্তি হলো শহরের একটি ভালো প্রাইভেট কলেজে। আর আমি ভর্তি হলাম আমাদের উপজেলার সরকারি কলেজে।
তখন মোবাইল ফোনের এত চল ছিল না। ফলে আকাশের সঙ্গে যোগাযোগ করাটাও হঠাৎ করে খুব কঠিন হয়ে গেল।
আকাশ নাকি আমাদের কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর মা চাইতেন, ছেলে ভালো কলেজে পড়ুক, ভালো ফল করুক, ভবিষ্যতে ডাক্তার হোক।
আমি কলেজে যেতাম, ক্লাস করতাম, বই খুলে বসতাম—কিন্তু পড়াশোনায় মন বসত না।
শুধু মনে হতো, আকাশ এখন কোথায়?
আগের মতো আকাশও আর বাড়িতে আসত না।
প্রায় দুই মাস পর একদিন আকাশ বাড়িতে এলো। আমি পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখি, আকাশ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি কাছে গিয়ে বললাম—
—“কথা বলো না কেন?”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—
—“শহরে ভালো ভালো মেয়েদের সঙ্গে দেখা হয়েছে।”
আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
আমি কিছু বলার আগেই আকাশ মুচকি হেসে বলল—
—“তুমি পৃথিবীর ওপারেও চলে যাও, তোমার সঙ্গে আমার দূরত্ব কখনো হবে না। জানো, পড়াশোনার পাশাপাশি তোমার মুখটাই কল্পনা করি। বিশ্বাস করো।”
সেদিন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ মনে হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনে পড়াশোনার চাপ বাড়তে লাগল।
এরপর এলো এইচএসসির ফলাফল।
আকাশ আবারও গোল্ডেন A+ পেল।
তারপর মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আবার কোচিংয়ে ভর্তি হলো।
আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম।
কিন্তু জীবন যেন ধীরে ধীরে আমাদের দুজনকে দুই দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
কখনো কখনো ছয় মাসেও আকাশের সঙ্গে আমার কোনো কথা হতো না।
একদিন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে ওকে জিজ্ঞেস করলাম—
—“এমন করছ কেন?”
আকাশ শুধু বলল—
—“শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।”
কিন্তু তখন আমার মন আর কথায় বিশ্বাস করতে চাইত না।
কারণ ভালোবাসা যদি এত গভীর হয়, তাহলে এত দীর্ঘ নীরবতা কেন?
এদিকে আকাশের মা ছেলের জন্য বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করলেন। ছেলে বড় হয়েছে, ভালো পড়াশোনা করছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন।
আকাশও বাড়িতে আসা প্রায় বন্ধ করে দিল।
পরিস্থিতি এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল, যেখানে আমাদের ভালোবাসা হয়তো হারিয়ে যেতে পারত।
শেষ পর্যন্ত আকাশের মা একদিন ছেলেকে বললেন—
—“ঠিক আছে, তোর পছন্দই আমার পছন্দ।”
হয়তো সেই একটা কথাই আমাদের এত বছরের অপেক্ষার শেষ উত্তর ছিল।
অবশেষে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।
যে আকাশ ছোটবেলায় পুকুরপাড় দিয়ে হাঁটত, অথচ মুখ ফুটে বলতে পারত না, “আমি তোমাকে ভালোবাসি”—সেই আকাশই একদিন আমার জীবনের মানুষ হয়ে গেল।
বিয়ের দুই দিন পর আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—
—“তিথি… সারপ্রাইজটা কেমন হলো?”
আমি কিছু বলতে পারিনি।
শুধু ওর দিকে তাকিয়ে হেসেছিলাম।
চোখের কোণে তখন জমে ছিল আনন্দের জল।
মনে হচ্ছিল, কত বছর ধরে যে অপেক্ষা করেছি এই একটা দিনের জন্য!
যে ভালোবাসা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে এক নজর দেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল, যে ভালোবাসা নদীর ধারে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বড় হয়েছিল, যে ভালোবাসা দূরত্ব, অভিমান আর নীরবতার মধ্যেও হারিয়ে যায়নি—শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসাই আমার জীবনের ঠিকানা হয়ে গেল।
কিছু ভালোবাসা মুখে বলা হয় না।
কিছু ভালোবাসার কোনো চিঠি থাকে না।
কিছু ভালোবাসা শুধু চোখে চোখে লেখা থাকে।
আর কিছু ভালোবাসা…
বহু বছর অপেক্ষা করিয়ে একদিন হঠাৎ এসে বলে—
“তিথি, সারপ্রাইজটা কেমন হলো?”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

পুকুরপাড়ের সেই ভালোবাসা

Update Time : ১০:৩১:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

 ইয়াসমিন আক্তার
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর প্রতিদিন পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম—শুধু এক নজর আকাশকে দেখব বলে।
আকাশ…
ছেলেটার মুখটা ছিল ভীষণ মায়াবী। আমার পুকুরপাড় ধরেই প্রায়ই হাঁটত। ওকে দেখলেই বুঝতে পারতাম, আমাকে ওর ভালো লাগে। কিন্তু আকাশ ছিল অসম্ভব লাজুক। জীবনে কখনো মুখ ফুটে একটা কথাও বলতে পারেনি।
তবুও ওর চোখ দুটো যেন সব কথা বলে দিত।
আমি কোথাও বেড়াতে গেলে, কয়েকদিন পর যখন বাড়ি ফিরতাম, দূর থেকেই আকাশের চোখে একটা অভিমান দেখতে পেতাম। মনে হতো, ওর চোখ দুটো যেন বলছে—
“তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে এতদিন?”
এভাবেই নীরবে আমাদের ভালো লাগার দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।
একবার নানুর বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। নদীর ধারে নানুর বাড়ি। ভেবেছিলাম কয়েকদিন থেকেই ফিরে আসব। কিন্তু দেখতে দেখতে পাঁচ দিন হয়ে গেল।
পঞ্চম দিনের বিকেলে নানুর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি—আকাশ দাঁড়িয়ে আছে!
ওর চোখে ভীষণ অভিমান।
আমি বুঝতে পারছিলাম না, ওর সঙ্গে কথা বলব কি না। ঠিক তখনই আকাশ আমাকে ডাকল—
—“তিথি, শুন!”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই প্রথম আকাশের মুখে নিজের নাম শুনলাম।
—“আরে আকাশ! তুমি এখানে কেন?”
আমি ওকে ভেতরে নিয়ে গেলাম।
আমার মামাতো বোন আকাশকে দেখে যেন একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। তখনই বুঝলাম, সে আকাশকে পছন্দ করে ফেলেছে।
কিন্তু আকাশের চোখের সেই অভিমান আমার চোখ এড়াল না।
একপর্যায়ে আকাশ আমাকে বলল—
—“এসেছ বেড়াতে, এতদিন থাকতে হয়?”
আমি মুচকি হেসেছিলাম।
আকাশ কখনো আমাকে বলেনি, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
কিন্তু সেদিন আর কোনো সন্দেহ ছিল না।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম—আকাশ আমাকে ভালোবাসে।
সেদিনই আমি আকাশের সঙ্গে নানুর বাড়ি থেকে ফিরে এলাম। নদীর ধারের সেই পথ ধরে দুজন পাশাপাশি হাঁটছিলাম। চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ অন্যরকম সুন্দর হয়ে উঠেছিল।
আমাদের ভালোবাসা তখনও কারও কাছে প্রকাশ পায়নি। অথচ দুজনেই দুজনের মনের কথা জানতাম।
পড়াশোনা, দেখা হওয়ার অপেক্ষা, পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা—সবকিছু মিলিয়ে দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিল।
তারপর এলো এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের দিন।
আমার হাত কাঁপছিল। টেনশনে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
অবশেষে ফলাফল প্রকাশ হলো।
আকাশ গোল্ডেন A+ পেয়েছে।
আকাশের মা আনন্দে যেন পাড়া মাথায় তুলে ফেললেন। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও আমাকে নিয়ে দু-একটা কথা বললেন, যা আমার মনটা ভীষণ খারাপ করে দিল।
আমার ফলাফলও ভালো হয়েছিল। কিন্তু তখন থেকেই মনে হলো, আমাদের সামনে হয়তো কঠিন একটা পথ অপেক্ষা করছে।
আকাশ ভর্তি হলো শহরের একটি ভালো প্রাইভেট কলেজে। আর আমি ভর্তি হলাম আমাদের উপজেলার সরকারি কলেজে।
তখন মোবাইল ফোনের এত চল ছিল না। ফলে আকাশের সঙ্গে যোগাযোগ করাটাও হঠাৎ করে খুব কঠিন হয়ে গেল।
আকাশ নাকি আমাদের কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর মা চাইতেন, ছেলে ভালো কলেজে পড়ুক, ভালো ফল করুক, ভবিষ্যতে ডাক্তার হোক।
আমি কলেজে যেতাম, ক্লাস করতাম, বই খুলে বসতাম—কিন্তু পড়াশোনায় মন বসত না।
শুধু মনে হতো, আকাশ এখন কোথায়?
আগের মতো আকাশও আর বাড়িতে আসত না।
প্রায় দুই মাস পর একদিন আকাশ বাড়িতে এলো। আমি পুকুরপাড়ে গিয়ে দেখি, আকাশ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি কাছে গিয়ে বললাম—
—“কথা বলো না কেন?”
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—
—“শহরে ভালো ভালো মেয়েদের সঙ্গে দেখা হয়েছে।”
আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
আমি কিছু বলার আগেই আকাশ মুচকি হেসে বলল—
—“তুমি পৃথিবীর ওপারেও চলে যাও, তোমার সঙ্গে আমার দূরত্ব কখনো হবে না। জানো, পড়াশোনার পাশাপাশি তোমার মুখটাই কল্পনা করি। বিশ্বাস করো।”
সেদিন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ মনে হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনে পড়াশোনার চাপ বাড়তে লাগল।
এরপর এলো এইচএসসির ফলাফল।
আকাশ আবারও গোল্ডেন A+ পেল।
তারপর মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আবার কোচিংয়ে ভর্তি হলো।
আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম।
কিন্তু জীবন যেন ধীরে ধীরে আমাদের দুজনকে দুই দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
কখনো কখনো ছয় মাসেও আকাশের সঙ্গে আমার কোনো কথা হতো না।
একদিন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে ওকে জিজ্ঞেস করলাম—
—“এমন করছ কেন?”
আকাশ শুধু বলল—
—“শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।”
কিন্তু তখন আমার মন আর কথায় বিশ্বাস করতে চাইত না।
কারণ ভালোবাসা যদি এত গভীর হয়, তাহলে এত দীর্ঘ নীরবতা কেন?
এদিকে আকাশের মা ছেলের জন্য বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করলেন। ছেলে বড় হয়েছে, ভালো পড়াশোনা করছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন।
আকাশও বাড়িতে আসা প্রায় বন্ধ করে দিল।
পরিস্থিতি এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল, যেখানে আমাদের ভালোবাসা হয়তো হারিয়ে যেতে পারত।
শেষ পর্যন্ত আকাশের মা একদিন ছেলেকে বললেন—
—“ঠিক আছে, তোর পছন্দই আমার পছন্দ।”
হয়তো সেই একটা কথাই আমাদের এত বছরের অপেক্ষার শেষ উত্তর ছিল।
অবশেষে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।
যে আকাশ ছোটবেলায় পুকুরপাড় দিয়ে হাঁটত, অথচ মুখ ফুটে বলতে পারত না, “আমি তোমাকে ভালোবাসি”—সেই আকাশই একদিন আমার জীবনের মানুষ হয়ে গেল।
বিয়ের দুই দিন পর আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—
—“তিথি… সারপ্রাইজটা কেমন হলো?”
আমি কিছু বলতে পারিনি।
শুধু ওর দিকে তাকিয়ে হেসেছিলাম।
চোখের কোণে তখন জমে ছিল আনন্দের জল।
মনে হচ্ছিল, কত বছর ধরে যে অপেক্ষা করেছি এই একটা দিনের জন্য!
যে ভালোবাসা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে এক নজর দেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল, যে ভালোবাসা নদীর ধারে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বড় হয়েছিল, যে ভালোবাসা দূরত্ব, অভিমান আর নীরবতার মধ্যেও হারিয়ে যায়নি—শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসাই আমার জীবনের ঠিকানা হয়ে গেল।
কিছু ভালোবাসা মুখে বলা হয় না।
কিছু ভালোবাসার কোনো চিঠি থাকে না।
কিছু ভালোবাসা শুধু চোখে চোখে লেখা থাকে।
আর কিছু ভালোবাসা…
বহু বছর অপেক্ষা করিয়ে একদিন হঠাৎ এসে বলে—
“তিথি, সারপ্রাইজটা কেমন হলো?”