Hi

ঢাকা ১১:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাবার ছায়া, ভালোবাসার আশ্রয়

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৫২:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৫ Time View

ইয়াসমিন আক্তার

আয়রা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। চোখভরা স্বপ্ন, বুকভরা সাহস আর বাবাকে ঘিরে ছিল তার ভবিষ্যতের সমস্ত কল্পনা। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাবার মৃত্যুসংবাদ তার জীবনের সব হিসাব পাল্টে দিল। মুহূর্তেই যেন মাথার ওপর থেকে আকাশটা সরে গেল। আয়রার বাবা ছিলেন একজন কলেজের অধ্যাপক। চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে একটি এলাকায় বসতি গড়েছিলেন, কিনেছিলেন জমি, তৈরি করেছিলেন নিজেদের বাড়ি। পরিবারের সবাই শিক্ষিত, প্রত্যেকেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সেই পরিবারটিই কিছু মানুষের ঈর্ষা আর কটূক্তির শিকার হলো। বাড়িতে মা আর ছোট বোনকে নিয়ে আয়রা। দুই ভাই চাকরির কারণে ঢাকায় থাকত। ভাইয়েরা টাকা পাঠালেও সংসারের প্রতিদিনের দায়িত্ব সামলাতে হতো আয়রাকেই। বাজার করা থেকে শুরু করে মায়ের দেখাশোনা, ছোট বোনের নিরাপত্তা—সবকিছুই যেন তার একার লড়াই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে মানুষের বাঁকা কথা শুনতে হতো। কেউ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলত, কেউ আবার অসহায় পরিবারটির সম্পত্তি ও অভিভাবকহীনতার সুযোগ নিতে চাইত। আয়রা প্রতিবাদ করত না বলে তাকে দুর্বল ভাবার ভুল করত অনেকে। অথচ তার নীরবতার আড়ালে জমে উঠছিল এক দুর্দমনীয় শক্তি। রাতের অন্ধকারে বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সে প্রায়ই বলত, —বাবা, তুমি নেই, কিন্তু তোমার স্বপ্নগুলো তো এখনো বেঁচে আছে। আমি হার মানব না। একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াব, তোমার নাম উজ্জ্বল করব। তারপর চোখের জল মুছে আবার বই খুলে বসত সে। এই কঠিন সময়েই আয়রার জীবনে আসে আরিয়ান। সে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র, শান্ত, মার্জিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন তরুণ। ক্যাম্পাসে একদিন আয়রার স্নিগ্ধ মুখ আর বিষণ্ন চোখ তার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিল। শ্যামলা মুখের মেয়েটির মধ্যে এমন এক মায়া ছিল, যা বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও গভীর। ধীরে ধীরে আরিয়ান বুঝতে পারল, আয়রার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য দুঃখের গল্প। সে কখনো করুণা দেখিয়ে আয়রার কাছে আসেনি; বরং তার আত্মসম্মানকে শ্রদ্ধা করেছে, তার স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছে। একদিন আরিয়ান বলেছিল, —জীবনে সবাই পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সত্যিকারের আপন মানুষ সে-ই, যে তোমার কঠিন সময়েও তোমার স্বপ্নের ওপর বিশ্বাস রাখে। তুমি পারবে, আয়রা। নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না। কথাগুলো আয়রার হৃদয়ে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। বাবার শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু আরিয়ানের বিশ্বাস তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছিল। এরপর শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়। সংসারের দায়িত্ব সামলে, মানুষের কটূক্তি উপেক্ষা করে, শত বাধার মধ্যেও আয়রা পড়াশোনা চালিয়ে গেল। আরিয়ান পাশে রইল—কখনো সাহস হয়ে, কখনো পরামর্শ হয়ে, কখনো নিঃশব্দ সমর্থন হয়ে। সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। একদিন আয়রা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করল। নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম আর অদম্য মনোবল দিয়ে গড়ে তুলল নিজের পরিচয়। সে হয়ে উঠল একজন স্বাবলম্বী ও সফল মানুষ। মায়ের মুখে ফিরল স্বস্তির হাসি, ছোট বোনের চোখে জ্বলে উঠল নতুন স্বপ্ন। যে মানুষগুলো একসময় তাদের দুর্বল ভেবেছিল, তারাই একদিন আয়রার সাফল্যের গল্প বলতে শুরু করল। সেদিন বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আয়রার চোখ ভিজে উঠল। মনে হলো, বাবা যেন দূর আকাশ থেকে মেয়ের সাফল্য দেখছেন। আরিয়ান পাশে এসে দাঁড়াল। আয়রা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, —জানো, আমি জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি। কিন্তু নিজের স্বপ্ন হারাইনি। আরিয়ান উত্তর দিল, —আর তুমি কখনো একা লড়োনি, আয়রা। তোমার সাহসের ওপর আমার বিশ্বাস ছিল, আছে, থাকবে। আয়রা বুঝল, জীবনে সফল হওয়ার জন্য নিজের শক্তিই সবচেয়ে বড় অবলম্বন; আর সেই পথচলায় একজন সত্যিকারের মানুষের ভালোবাসা হতে পারে অতিরিক্ত সাহস। কারণ বাবার ছায়া হারিয়ে আয়রা থেমে যায়নি। সে নিজের আলোয় পথ চিনেছে, নিজের যোগ্যতায় পৃথিবী জয় করেছে। আরিয়ান সেই আলো হয়ে ওঠেনি—সে হয়ে উঠেছিল আয়রার পাশে থাকা মানুষটি, যে তার আলোকে নিভতে দেয়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

উৎসবমুখর পরিবেশে ভালুকায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

বাবার ছায়া, ভালোবাসার আশ্রয়

Update Time : ০৮:৫২:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ইয়াসমিন আক্তার

আয়রা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। চোখভরা স্বপ্ন, বুকভরা সাহস আর বাবাকে ঘিরে ছিল তার ভবিষ্যতের সমস্ত কল্পনা। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাবার মৃত্যুসংবাদ তার জীবনের সব হিসাব পাল্টে দিল। মুহূর্তেই যেন মাথার ওপর থেকে আকাশটা সরে গেল। আয়রার বাবা ছিলেন একজন কলেজের অধ্যাপক। চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে একটি এলাকায় বসতি গড়েছিলেন, কিনেছিলেন জমি, তৈরি করেছিলেন নিজেদের বাড়ি। পরিবারের সবাই শিক্ষিত, প্রত্যেকেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সেই পরিবারটিই কিছু মানুষের ঈর্ষা আর কটূক্তির শিকার হলো। বাড়িতে মা আর ছোট বোনকে নিয়ে আয়রা। দুই ভাই চাকরির কারণে ঢাকায় থাকত। ভাইয়েরা টাকা পাঠালেও সংসারের প্রতিদিনের দায়িত্ব সামলাতে হতো আয়রাকেই। বাজার করা থেকে শুরু করে মায়ের দেখাশোনা, ছোট বোনের নিরাপত্তা—সবকিছুই যেন তার একার লড়াই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে মানুষের বাঁকা কথা শুনতে হতো। কেউ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলত, কেউ আবার অসহায় পরিবারটির সম্পত্তি ও অভিভাবকহীনতার সুযোগ নিতে চাইত। আয়রা প্রতিবাদ করত না বলে তাকে দুর্বল ভাবার ভুল করত অনেকে। অথচ তার নীরবতার আড়ালে জমে উঠছিল এক দুর্দমনীয় শক্তি। রাতের অন্ধকারে বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সে প্রায়ই বলত, —বাবা, তুমি নেই, কিন্তু তোমার স্বপ্নগুলো তো এখনো বেঁচে আছে। আমি হার মানব না। একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াব, তোমার নাম উজ্জ্বল করব। তারপর চোখের জল মুছে আবার বই খুলে বসত সে। এই কঠিন সময়েই আয়রার জীবনে আসে আরিয়ান। সে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র, শান্ত, মার্জিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন তরুণ। ক্যাম্পাসে একদিন আয়রার স্নিগ্ধ মুখ আর বিষণ্ন চোখ তার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিল। শ্যামলা মুখের মেয়েটির মধ্যে এমন এক মায়া ছিল, যা বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও গভীর। ধীরে ধীরে আরিয়ান বুঝতে পারল, আয়রার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য দুঃখের গল্প। সে কখনো করুণা দেখিয়ে আয়রার কাছে আসেনি; বরং তার আত্মসম্মানকে শ্রদ্ধা করেছে, তার স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছে। একদিন আরিয়ান বলেছিল, —জীবনে সবাই পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সত্যিকারের আপন মানুষ সে-ই, যে তোমার কঠিন সময়েও তোমার স্বপ্নের ওপর বিশ্বাস রাখে। তুমি পারবে, আয়রা। নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না। কথাগুলো আয়রার হৃদয়ে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। বাবার শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু আরিয়ানের বিশ্বাস তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছিল। এরপর শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়। সংসারের দায়িত্ব সামলে, মানুষের কটূক্তি উপেক্ষা করে, শত বাধার মধ্যেও আয়রা পড়াশোনা চালিয়ে গেল। আরিয়ান পাশে রইল—কখনো সাহস হয়ে, কখনো পরামর্শ হয়ে, কখনো নিঃশব্দ সমর্থন হয়ে। সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। একদিন আয়রা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করল। নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম আর অদম্য মনোবল দিয়ে গড়ে তুলল নিজের পরিচয়। সে হয়ে উঠল একজন স্বাবলম্বী ও সফল মানুষ। মায়ের মুখে ফিরল স্বস্তির হাসি, ছোট বোনের চোখে জ্বলে উঠল নতুন স্বপ্ন। যে মানুষগুলো একসময় তাদের দুর্বল ভেবেছিল, তারাই একদিন আয়রার সাফল্যের গল্প বলতে শুরু করল। সেদিন বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আয়রার চোখ ভিজে উঠল। মনে হলো, বাবা যেন দূর আকাশ থেকে মেয়ের সাফল্য দেখছেন। আরিয়ান পাশে এসে দাঁড়াল। আয়রা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, —জানো, আমি জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি। কিন্তু নিজের স্বপ্ন হারাইনি। আরিয়ান উত্তর দিল, —আর তুমি কখনো একা লড়োনি, আয়রা। তোমার সাহসের ওপর আমার বিশ্বাস ছিল, আছে, থাকবে। আয়রা বুঝল, জীবনে সফল হওয়ার জন্য নিজের শক্তিই সবচেয়ে বড় অবলম্বন; আর সেই পথচলায় একজন সত্যিকারের মানুষের ভালোবাসা হতে পারে অতিরিক্ত সাহস। কারণ বাবার ছায়া হারিয়ে আয়রা থেমে যায়নি। সে নিজের আলোয় পথ চিনেছে, নিজের যোগ্যতায় পৃথিবী জয় করেছে। আরিয়ান সেই আলো হয়ে ওঠেনি—সে হয়ে উঠেছিল আয়রার পাশে থাকা মানুষটি, যে তার আলোকে নিভতে দেয়নি।