“শেষ বিকেলে সুপ্রভা”
-
Reporter Name - Update Time : ০৭:১১:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২
- ২৫২ Time View

মোশারফ সোহেল, ময়মনসিংহ।
বন্ধু, তুমি কি আমায় নিয়ে যাবে ৭০ মাইল দূরের অচিন কোন গাঁয়।দিনের আলোয় মেঘ ঢেকেছে কিন্তু আমার মনের আলোয় তো মেঘ নেই।পথিকের চরণ ধূলিতেই তো পথ আলোকিত হয় নইলে পথের ধারে সবুজ দূর্বাঘাসের সৌন্দর্যের কিইবা দাম আছে? বন্ধু তোমার বর্ণনার প্রকাশে আমি নাইবা থাকলাম, মুগ্ধ শ্রোতা তো হতে পারি। আচ্ছা চলো…..
গহীন অরণ্য মাঝে পিচ ঢালা পথ। ঘুঘু পাখির উড়ে যাওয়া,হঠাৎ বেরসিক ট্রাকের কর্কশ পেপু শব্দে লাফিয়ে পড়া বানর এ যেন আমার নয়নে মুগ্ধতার ছন্দপতন।ষোড়শী কিংবা অষ্টাদশীর হাতে হাত রেখে হেঁটে চলা স্কুল-কলেজগামী তরুণ, মাঠে মাঠে কৃষাণ-কৃষাণীর পিনপতন নিরবতায় সোনালী ফসল ঘরে তোলার দৃশ্য, রসালো ফল আনারসের স্তুপ, প্রচন্ড বাতাসের ধাক্কায় পথের দুপাশে পড়ে থাকা আকাশি গাছের অসহায় আত্মসমর্পণ,ঢেউ তোলানো রাস্তায় উঁচু-নিচু ব্রিজ-কালভার্টের অসুন্দর বিশ্রী মিলন মেলায় সৃষ্ট আমার কোমরে ব্যথা আর বেলা শেষে ডুবন্ত সূর্য কে সাথে নিয়ে অচিন মানুষের গৃহে প্রবেশ।নমস্কার,কাকিমা কেমন আছেন?উনি কে?উনি অচেনার মাঝে নিজের ঠিকানা চান, অদেখা কে দেখতে চান, অজানাকে জানতে চান। উনি চির নতুন করিয়া বারবার আসতে চান। উনি আপনাদের মেহমান। ঠিক আছে,চলুন ঘরে চলুন। স্বল্প পরিচয়ের মাঝে বৃহৎ পরিচয় হারিয়ে যাক তা আমি চাইনা, চলুন আন্টি ঘরে চলুন।
আমি হকচকিয়ে ঘরের চারপাশে তাকালাম আর মনে মনে অতিশয় ক্ষুদ্রাকায় বসার একটি আসনের সন্ধান করিলাম। হঠাৎ মায়াবী কোমল কন্ঠে মৃদু আহ্বান- ”মামা একটু লেবু জল খেয়ে নিন”। এই সম্ভাষণে আমি হৃদয়ে ঠান্ডা অনুভূতি পেলাম আর অবাক হয়ে ঘাঁড় ঘুরিয়ে উপরে তাকালাম।দেখি দিব্যি একটি গোলাপ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, পদ্ম পাতার জলের হাসি আমার সামনে। এ যেন স্ফটিক স্বচ্ছ জলে একটি নীল পরীর প্রতিচ্ছবি। একটি গেজ দাঁত তার মিষ্টি হাসির সাথে বেশ মিতালি করেছে। ঐ গেজ দাঁতের জন্ম সার্থক হয়েছে। সুবর্ণ, ফর্সা,অবয়বের সাথে তার মায়াময় চাহনী,হাত দুটিতে বালা জোড়ার অপূর্ব সন্নিবেশ ঘটিয়েছে। আবারো মৃদু আহ্বান, মামা একটু লেবু জল, প্লিজ। হঠাৎ একজন আমায় বললেন, তুমি তো আমাদের ভাইই হও তাই না?আমি চুপ,ভীষণ চুপ। শব্দচয়নের প্রকাশ থেকে বিরতি নিলাম, চুপ থাকলাম। ও আমাদের সুপ্রভা, আমাদের বৌমা। মেহমানদের খানাপিনা দাওগো বৌমা। জ্বি,মা সব রেডি আছে। আপনারা আসুন, খাবার টেবিলে বসুন। বিভিন্ন ধরনের খাবারে টেবিলটা এমন কোণঠাসা হয়ে আছে যেন অন্ততপক্ষে একটি খাবারও বিদায় নিলে টেবিল বেচারি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এত সূক্ষ্ম চিকন চালের পোলাও এর আগে খেয়েছি বা দেখেছি কিনা তা বেমালুম ভুলেই গেছি। এর সুঘ্রাণ আর চিকচিক করা চাহনি,উফ!খেয়ে একদম টাইট হয়ে গেলাম। সুপ্রভার অতি তীক্ষ্ণ নজরদারিতে কোন আইটেম বাদ পড়ার সুযোগ নেই।মামা,একটু মাছ,মাংস, একটু লাল চালের প্লেন রাইস দিই। না করবেন না প্লিজ। পাশেই দাঁড় কাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার দেবর বাবুর অনুরোধ সব গুলো আইটেম ই দেন যেন কোনটা বাদ না পড়ে। হঠাৎ গলায় একটু খুসখুস ভাব। আমি হাত বাড়াতেই ,জলের গ্লাস আমার হাতে। মামা ধীরে ধীরে খান।
আমি একজন দূরের মানুষ, নিতান্তই সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ, এই জীবনে কোনদিন দেখা হয়নি আর হবেও কিনা তা উপরওয়ালাই ভালো জানেন। একজন ক্ষণিকের অতিথির প্রতি এত মায়া,এত সমীহ,এত সম্মান, এত আয়োজন,এত কাছে এসে অনাত্মীয় কে আত্মার বন্ধনে ক’জনাই বা বাধিতে পারে। খাবার টেবিলে কথা প্রসঙ্গে সুপ্রভার ঠাকুরমার চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ এলেই সুপ্রভার চোখে জল। আজকে সুপ্রভার ঠাকুরমা আমাদের সাথে চলে যাবেন। সুপ্রভার অশ্রু, আঁচলে চোখ মুছা আর ভাঙা কন্ঠে বলে ওঠা আমার ঠাকুরমা স্বয়ং উপরওয়ালার পরম আশীর্বাদ।এই দুইটা মাস আমার ওপর পরম মমতা আর আশীর্বাদের যে ছাতা ছিল তার বিদায় আমি দিতে পারি না। ঠিক সেই মুহুর্তে সুপ্রভার ঠাকুরমা পরম স্নেহে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন খাও, বাবা খাও, ধীরে ধীরে খাও। আট বছর বয়সের পর এমন মায়ায় কেউ আমায় বলেনি বাবা, তুমি……….।
সুপ্রভার চোখের জলে এতো নির্ভরতা, এতো দায়িত্ব,এতো আবেগ এটাই স্পষ্ট হয় যে, সত্যিই এ জগত সংসার মায়া মমতায় ঘেরা এক বন্ধন সেটা হোক না যতই ক্ষনিকের। মানুষ বরাবরই কাছের মানুষকেই আরোও আপন করে পেতে চায় যদিও সেখানে স্বার্থপরতা থাকে। দূরের মানুষকে আপন বাঁধনে বাধিতকরনে কোনো স্বার্থপরতা নেই বরং শিহরণ আছে হৃদয়ের প্রচন্ড শিহরন।
আমার বাংলা মায়ের বুকে এরকম হাজারো সুপ্রভার স্নেহ-ভালবাসায় টিকে আছে প্রতিটি সংসার। মুহূর্তে যে পরকে আপন করতে পারে,ক্ষণিকের অতিথি কে যে সাদরে গ্রহণ করতে পারে, আস্থার বাঁধনে যে বাধিত করতে পারে সকলকে,সে তো অবশ্যই প্রতিটি সংসারের আলোর বাতিঘর। সুপ্রভার আলোয় আলোকিত হোক,এ দেশ, সমাজ, সংসার । ভালো থেকো সুপ্রভা,ভালো থেকো।


















