Hi

ঢাকা ০৪:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শূন্য থেকে শিখরে: নারী উদ্যোক্তা সুলতানা পারভীনের জয়গাথা

বিশেষ প্রতিনিধি:

অদম্য ইচ্ছা শক্তি মানুষকে কতটা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে তার জলন্ত উদাহারণ সুলতানা পারভীন।

ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে ঘরে বসেও গড়া যায় সফলতার নতুন দিগন্ত—এমনই এক অনুপ্রেরণার নাম সুলতানা পারভীন। জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে উঠে এসে নিজের অদম্য চেষ্টা, সাহস ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
১৯৯০ সালে স্বামীর ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির পর হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে সুলতানার পরিবার। সেই কঠিন সময়েও ভেঙে না পড়ে বরং দৃঢ় মনোবল নিয়ে পরিবারের হাল নিজের হাতে তুলে নেন তিনি।তিনি নিজ এলাকায় পার্লার কসমেটিক্স ও হোমমেইড খাবারের ব্যবসা শুরু করেন।পরবর্তি সময় পারিবারিক কারনে ব্যবসা বন্ধ করে ২০০২’সালে ঢাকা মেয়ের বাসায় চলে যান।ঢাকা মেয়ের বাসায় বসেই ছোট পরিসরে শুরু করেন হোমমেড খাবারের ব্যবসা। শুরুটা ছিল অত্যন্ত সংগ্রামের—অভাব, অনিশ্চয়তা আর সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
প্রথমদিকে পরিবারের সহায়তায় নিজ হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পিঠা, কেক, স্ন্যাকস ও দেশীয় খাবার প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছে বিক্রি করতেন সুলতানা। ধীরে ধীরে তার খাবারের স্বাদ, মান ও আন্তরিক সেবা মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্রেতার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে তার আত্মবিশ্বাসও। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও কাজে লাগান, যার ফলে তার ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয় এবং নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
বর্তমানে সুলতানার “সুলতানা কিচেন” একটি লাভজনক ও স্থিতিশীল হোমমেড ফুড ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের অর্ডার সামলাতে তাকে ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। স্বাস্থ্যসম্মত প্রস্তুত প্রণালী, গুণগত মান এবং আন্তরিক সেবার কারণে তিনি ক্রেতাদের কাছে একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছেন। ভালুকা ও আশপাশের এলাকায় তার খাবারের সুনাম এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই সফল উদ্যোগের মাধ্যমে সুলতানা শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বরং একটি পরিবারকেও সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়েছেন। তার আয়ের ওপর ভর করেই তিনি সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। বড় মেয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। তার জামাইও একজন চিকিৎসক, দুজনেই মানবসেবায় নিয়োজিত। ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে লালমাটিয়া কলেজে অনার্সে পড়াশোনা করছেন এবং তার স্বামী একজন প্রকৌশলী, যিনি একটি ব্যাংকে চাকরি করছেন।
মূলত শেরপুরের বাসিন্দা সুলতানা পারভীন বর্তমানে ছেলের চাকরির সুবাদে ২০২২ সাল থেকে ভালুকায় বসবাস করছেন। তবে তার উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০২ সালে ঢাকায়, যা দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলছে।
সুলতানা বলেন, “শুরুতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। আলহামদুলিল্লাহ, আজ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি এবং পরিবারের পাশে থাকতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”
শুধু নিজের সাফল্যে থেমে থাকেননি তিনি। আশপাশের আরও কয়েকজন নারীকে কাজের সুযোগ দিয়ে তাদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন এই উদ্যোক্তা। ফলে তার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয়দের মতে, সুলতানার মতো সাহসী ও পরিশ্রমী নারীরা সমাজে এগিয়ে এলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং নারীর ক্ষমতায়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
সুলতানা পারভীনের এই সাফল্যের গল্প আজ শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার জীবন প্রমাণ করে—স্বপ্ন দেখার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় মনোবল থাকলে যে কোনো প্রতিকূলতাকেই জয় করা সম্ভব।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

শূন্য থেকে শিখরে: নারী উদ্যোক্তা সুলতানা পারভীনের জয়গাথা

শূন্য থেকে শিখরে: নারী উদ্যোক্তা সুলতানা পারভীনের জয়গাথা

Update Time : ১০:১৩:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি:

অদম্য ইচ্ছা শক্তি মানুষকে কতটা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে তার জলন্ত উদাহারণ সুলতানা পারভীন।

ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে ঘরে বসেও গড়া যায় সফলতার নতুন দিগন্ত—এমনই এক অনুপ্রেরণার নাম সুলতানা পারভীন। জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে উঠে এসে নিজের অদম্য চেষ্টা, সাহস ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
১৯৯০ সালে স্বামীর ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির পর হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে সুলতানার পরিবার। সেই কঠিন সময়েও ভেঙে না পড়ে বরং দৃঢ় মনোবল নিয়ে পরিবারের হাল নিজের হাতে তুলে নেন তিনি।তিনি নিজ এলাকায় পার্লার কসমেটিক্স ও হোমমেইড খাবারের ব্যবসা শুরু করেন।পরবর্তি সময় পারিবারিক কারনে ব্যবসা বন্ধ করে ২০০২’সালে ঢাকা মেয়ের বাসায় চলে যান।ঢাকা মেয়ের বাসায় বসেই ছোট পরিসরে শুরু করেন হোমমেড খাবারের ব্যবসা। শুরুটা ছিল অত্যন্ত সংগ্রামের—অভাব, অনিশ্চয়তা আর সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
প্রথমদিকে পরিবারের সহায়তায় নিজ হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পিঠা, কেক, স্ন্যাকস ও দেশীয় খাবার প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছে বিক্রি করতেন সুলতানা। ধীরে ধীরে তার খাবারের স্বাদ, মান ও আন্তরিক সেবা মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্রেতার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে তার আত্মবিশ্বাসও। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও কাজে লাগান, যার ফলে তার ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয় এবং নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
বর্তমানে সুলতানার “সুলতানা কিচেন” একটি লাভজনক ও স্থিতিশীল হোমমেড ফুড ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের অর্ডার সামলাতে তাকে ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। স্বাস্থ্যসম্মত প্রস্তুত প্রণালী, গুণগত মান এবং আন্তরিক সেবার কারণে তিনি ক্রেতাদের কাছে একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছেন। ভালুকা ও আশপাশের এলাকায় তার খাবারের সুনাম এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই সফল উদ্যোগের মাধ্যমে সুলতানা শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বরং একটি পরিবারকেও সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়েছেন। তার আয়ের ওপর ভর করেই তিনি সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। বড় মেয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। তার জামাইও একজন চিকিৎসক, দুজনেই মানবসেবায় নিয়োজিত। ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে লালমাটিয়া কলেজে অনার্সে পড়াশোনা করছেন এবং তার স্বামী একজন প্রকৌশলী, যিনি একটি ব্যাংকে চাকরি করছেন।
মূলত শেরপুরের বাসিন্দা সুলতানা পারভীন বর্তমানে ছেলের চাকরির সুবাদে ২০২২ সাল থেকে ভালুকায় বসবাস করছেন। তবে তার উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০২ সালে ঢাকায়, যা দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলছে।
সুলতানা বলেন, “শুরুতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। আলহামদুলিল্লাহ, আজ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি এবং পরিবারের পাশে থাকতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”
শুধু নিজের সাফল্যে থেমে থাকেননি তিনি। আশপাশের আরও কয়েকজন নারীকে কাজের সুযোগ দিয়ে তাদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন এই উদ্যোক্তা। ফলে তার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয়দের মতে, সুলতানার মতো সাহসী ও পরিশ্রমী নারীরা সমাজে এগিয়ে এলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং নারীর ক্ষমতায়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
সুলতানা পারভীনের এই সাফল্যের গল্প আজ শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার জীবন প্রমাণ করে—স্বপ্ন দেখার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় মনোবল থাকলে যে কোনো প্রতিকূলতাকেই জয় করা সম্ভব।