রং নাম্বারের ওপারে তুমি
-
Reporter Name - Update Time : ১১:০৩:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ১ Time View

লেখিকা: ইয়াসমিন আক্তার
জুঁই তখন কলেজে পড়ে। ছোট্ট একটা সংসার, আর মায়ের পুরোনো ছোট ফোনটাই ছিল তার অবসরের সঙ্গী। মাঝে মাঝে গেম খেলতে ফোনটা হাতে নিত।
একদিন হঠাৎ সেই ফোনেই বেজে উঠল অচেনা একটি নম্বর।
“হ্যালো, সৌরভ বলছি।”
জুঁই অবাক হয়ে বলল,
“সরি, আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।”
কথাটা সেদিন সেখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিছু ভুল নম্বর যে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে উঠতে পারে, সেটা তখন জুঁই জানত না।
এরপর সৌরভ নিয়ম করে ফোন করতে লাগল। জুঁই বারবার বলত,
— “আপনি আমাকে ফোন করবেন না, প্লিজ।”
কিন্তু সৌরভ হেসে বলত,
— “আপনার কণ্ঠটা এত সুন্দর, কথা বলতে ভালো লাগে।”
মুখে বিরক্তি দেখালেও অজান্তেই জুঁই অপেক্ষা করতে শুরু করল সেই ফোনটার জন্য। ফোনটা না এলে মনটা কেমন খালি খালি লাগত। অথচ কাউকে সে কিছু বলত না।
সৌরভ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এক বছর গ্যাপ যাওয়ায় বেশিরভাগ সময়ই সে ফ্রি থাকত। আর সেই অবসর সময়ের অনেকটা জুড়েই ছিল জুঁইয়ের সঙ্গে কথা বলা।
এভাবেই কেটে গেল একটা বছর।
একটা বছর—চোখে না দেখা একজন মানুষের কণ্ঠকে ভালোবেসে ফেলার জন্য হয়তো যথেষ্ট সময়।
তারপর একদিন সৌরভ বলল,
— “জুঁই, আমি তোমাকে আর কোনোদিন ফোন দেব না।”
কথাটা শুনে জুঁই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সে জিজ্ঞেসও করল না, “কেন?”
শুধু ফোনটা রেখে দেওয়ার পর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভেঙে গেল।
সেদিন প্রথম জুঁই বুঝল—যে মানুষটাকে এতদিন বলেছে “ফোন দিও না”, সেই মানুষটার ফোনের অপেক্ষাতেই তার দিন কেটে যেত।
হয়তো সৌরভ তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন জীবনে চলে গিয়েছিল। হয়তো সে শুধু অবসর কাটানোর জন্য কথা বলেছিল। আবার হয়তো সত্যিই জুঁইয়ের প্রতি তার এক ধরনের টান জন্মেছিল।
কিন্তু সেই উত্তরটা কোনোদিন জুঁই জানতে পারেনি।
নিজের অহংকারের কাছে হেরে গিয়ে জুঁইও কোনোদিন বলতে পারেনি—
“সৌরভ, তোমাকে ভালোবাসি।”
সময়ের সঙ্গে জীবন এগিয়ে গেল। কিন্তু কিছু কণ্ঠস্বর কি কখনো পুরোনো হয়?
অনেক বছর পর একদিন জুঁই সৌরভ যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, সেই ক্যাম্পাসে গেল। চারপাশে এত মানুষ, এত মুখ—তবুও তার চোখ যেন অজান্তেই একজনকেই খুঁজছিল।
হয়তো সৌরভকে সে কোনোদিন চোখে দেখেনি।
তবুও মনে হচ্ছিল, ভিড়ের কোথাও দাঁড়িয়ে হয়তো সেই পরিচিত কণ্ঠটা আবার বলবে—
“জুঁই, আপনার কণ্ঠটা আজও অনেক সুন্দর।”
জুঁই মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিল।
সৌরভকে সে খুঁজে পেল না।
কিন্তু সেদিন বুঝল—
কিছু মানুষ জীবনে আসে থাকার জন্য নয়, একটা অসমাপ্ত গল্প হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য।
আর কিছু ভালোবাসা মুখে বলা হয় না…
শুধু একটা পুরোনো ফোনের রিংটোনের মতো,
নীরবে হৃদয়ের ভেতর বাজতে থাকে।
সৌরভের কণ্ঠটা আজও জুঁই মিস করে।
আর সেই রং নাম্বারটা?
জুঁইয়ের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ভুল নম্বর হয়ে আজও রয়ে গেছে।















