Hi

ঢাকা ০৪:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাটির মানুষের জীবন

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৩৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • ৮ Time View

ইয়াসমিন আক্তার
অরুণ আর ত্রিনা—একটি গ্রামের সাধারণ পরিবারের দুজন মানুষ। তাদের জীবনেও স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল, আর ছিল প্রতিদিনের বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই।
অরুণ পেশায় একজন কৃষক। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাঁধে কোদাল নিয়ে মাঠে চলে যায়। কখনো রোদে পুড়ে, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলায়। ত্রিনা সংসারের কাজ সামলে হাঁস-মুরগি পালন করে। অভাবের সংসার, তবু দুজনের মুখে হাসি রাখার চেষ্টা।
একদিন ধানের জমিতে পানি দিতে গিয়ে অরুণ দেখল, পাশের জমির আইল ভেঙে পানি বেরিয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে সে জমিটা ঠিক করল। বাড়ি ফিরে দেখে ত্রিনা উঠানে বসে হিসাব করছে।
অরুণ জিজ্ঞেস করল, —কী হিসাব করছ?
ত্রিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —চালের টাকা, ছেলের স্কুলের বেতন আর তোমার মায়ের ওষুধের টাকা। সব মেলাতে পারছি না।
অরুণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —চিন্তা কোরো না, সামনের ফসলটা ভালো হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ত্রিনা মৃদু হেসে বলল, —তুমি প্রতিবারই এই কথা বলো। কিন্তু ফসলের সঙ্গে আমাদের ভাগ্যটাও তো ভালো হতে হবে!
সেদিন রাতে দুজনেরই ঘুম আসছিল না। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরে শিয়ালের আওয়াজ। ছোট্ট ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছিল। তবু তাদের অভিযোগ ছিল না একে অপরের বিরুদ্ধে।
কয়েক মাস পর ফসল ঘরে উঠল। কিন্তু ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়ে হাতে তেমন কিছুই থাকল না। তবু অরুণ ছেলের জন্য নতুন বই কিনল, আর ত্রিনা পুরোনো শাড়িটা দিয়েই পূজার দিনের মতো করে নিজেকে সাজাল।
রাতে উঠানে বসে ত্রিনা বলল, —আমাদের জীবনে কি কোনো দিন অভাব থাকবে না?
অরুণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, —জানি না। তবে একটা কথা জানি, অভাবের কাছে হার মানলে চলবে না। আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু আমাদের স্বপ্নগুলো গরিব নয়।
ত্রিনা স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাসল।
গ্রামের প্রতিটি ঘরেই হয়তো অরুণ আর ত্রিনার মতো মানুষ আছে। যারা প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে, নিজের ইচ্ছাগুলো বিসর্জন দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়।
কারণ গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন শুধু গল্প নয়, এ এক নীরব সংগ্রামের ইতিহাস।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

মাটির মানুষের জীবন

Update Time : ১২:৩৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

ইয়াসমিন আক্তার
অরুণ আর ত্রিনা—একটি গ্রামের সাধারণ পরিবারের দুজন মানুষ। তাদের জীবনেও স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল, আর ছিল প্রতিদিনের বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই।
অরুণ পেশায় একজন কৃষক। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাঁধে কোদাল নিয়ে মাঠে চলে যায়। কখনো রোদে পুড়ে, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলায়। ত্রিনা সংসারের কাজ সামলে হাঁস-মুরগি পালন করে। অভাবের সংসার, তবু দুজনের মুখে হাসি রাখার চেষ্টা।
একদিন ধানের জমিতে পানি দিতে গিয়ে অরুণ দেখল, পাশের জমির আইল ভেঙে পানি বেরিয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে সে জমিটা ঠিক করল। বাড়ি ফিরে দেখে ত্রিনা উঠানে বসে হিসাব করছে।
অরুণ জিজ্ঞেস করল, —কী হিসাব করছ?
ত্রিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —চালের টাকা, ছেলের স্কুলের বেতন আর তোমার মায়ের ওষুধের টাকা। সব মেলাতে পারছি না।
অরুণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —চিন্তা কোরো না, সামনের ফসলটা ভালো হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ত্রিনা মৃদু হেসে বলল, —তুমি প্রতিবারই এই কথা বলো। কিন্তু ফসলের সঙ্গে আমাদের ভাগ্যটাও তো ভালো হতে হবে!
সেদিন রাতে দুজনেরই ঘুম আসছিল না। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরে শিয়ালের আওয়াজ। ছোট্ট ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছিল। তবু তাদের অভিযোগ ছিল না একে অপরের বিরুদ্ধে।
কয়েক মাস পর ফসল ঘরে উঠল। কিন্তু ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়ে হাতে তেমন কিছুই থাকল না। তবু অরুণ ছেলের জন্য নতুন বই কিনল, আর ত্রিনা পুরোনো শাড়িটা দিয়েই পূজার দিনের মতো করে নিজেকে সাজাল।
রাতে উঠানে বসে ত্রিনা বলল, —আমাদের জীবনে কি কোনো দিন অভাব থাকবে না?
অরুণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, —জানি না। তবে একটা কথা জানি, অভাবের কাছে হার মানলে চলবে না। আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু আমাদের স্বপ্নগুলো গরিব নয়।
ত্রিনা স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাসল।
গ্রামের প্রতিটি ঘরেই হয়তো অরুণ আর ত্রিনার মতো মানুষ আছে। যারা প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে, নিজের ইচ্ছাগুলো বিসর্জন দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়।
কারণ গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন শুধু গল্প নয়, এ এক নীরব সংগ্রামের ইতিহাস।