যে ভালোবাসা হারিয়েও থেকে যায়
-
Reporter Name - Update Time : ০৯:০৩:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- ১ Time View

ইয়াসমিন আক্তার
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে খুব নীরবে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই। অথচ একসময় বুঝতে পারি—আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর সঙ্গে সেই মানুষটাই জড়িয়ে আছে।
নীল আর মেহরিনের গল্পটাও ছিল ঠিক তেমন।
তারা ছিল খুব কাছের বন্ধু। প্রতিদিন কথা হতো, একসঙ্গে হাসি-ঠাট্টা হতো, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো। বন্ধুরা অবশ্য অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিল—নীল মেহরিনকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখে না।
কিন্তু মেহরিন বুঝেও না বোঝার মতো করে থাকত।
এক রাতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সবাই বাড়ি ফিরছিল। তাই একেকজন বন্ধুর দায়িত্ব পড়ল একেকজনকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার। মেহরিনের দায়িত্বটা পড়েছিল নীলের হাতে।
চাঁদনী রাত ছিল সেদিন।
দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল। নীলের হাতটা মেহরিনের হাতের খুব কাছে ছিল। মেহরিন চাইলেই হাতটা ধরতে পারত, কিন্তু সেই বয়সে ভালোবাসার কথা স্বীকার করার মতো সাহস তার ছিল না।
পথে মেহরিন নাস্তা কিনে এনেছিল। নীলের পেট ভরা ছিল। তবুও মেহরিন দিয়েছিল বলে সে চুপচাপ খেয়ে নিয়েছিল।
সেদিনও কেউ কিছু বলেনি।
শুধু পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে দুজনের নীরবতাই যেন একে অপরকে বলে দিয়েছিল—তারা আসলে কতটা আপন।
সময় চলে গেল।
একসময় নীল নিজের অনুভূতিটা বুঝতে পারল। কিন্তু মেহরিনের পরিবার তার জন্য অন্য স্বপ্ন দেখে রেখেছিল।
বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য ছেলে দেখা শুরু হলো। ছেলেটি ছিল শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত এবং বিশেষ ক্যাডার সার্ভিসে কর্মরত।
মেহরিন পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারল না।
ঠিক তখনই এক রাতে নীল ফোন করল।
কণ্ঠটা কাঁপছিল।
—“মেহরিন, একটা কথা বলব?”
—“বলো।”
—“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
মেহরিন অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
এতদিন যে কথাটা শোনার জন্য তার মন অপেক্ষা করেছিল, সেই কথাটাই আজ শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভেঙে গেল।
সে ধীরে বলল,
—“নীল, তুমি যদি একটু আগে বলতে…”
বাকিটা আর বলতে পারল না।
ফোনের ওপাশে নীলও চুপ হয়ে গেল।
কখনো কখনো ভালোবাসা দেরিতে প্রকাশ পেলে তার সত্যিটা কমে যায় না, শুধু তার পরিণতিটা বদলে যায়।
মেহরিনের বিয়ে হয়ে গেল।
নীল তার জীবন থেকে দূরে সরে গেল।
বছরের পর বছর কেটে গেল।
একদিন শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ তাদের দেখা হয়ে গেল।
নীল মেহরিনের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,
—“কেমন আছো?”
মেহরিন হাসল।
—“ভালো আছি। তুমি?”
নীল মৃদু হেসে বলল,
—“ভালো থাকার অভিনয়টা শিখে গেছি।”
মেহরিনের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নীল বলল,
—“একটা কথা জানতে চাই। তুমি কি কখনো আমাকে ভালোবেসেছিলে?”
মেহরিন চোখ নামিয়ে বলল,
—“তুমি কি সত্যিই জানতে চাও?”
—“হ্যাঁ।”
মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“সেই চাঁদনী রাতটা মনে আছে?”
নীল অবাক হয়ে তাকাল।
—“মনে আছে।”
—“সেদিন তোমার হাতটা ধরতে খুব ইচ্ছে করেছিল। কিন্তু সাহস হয়নি।”
নীলের চোখে পানি এসে গেল।
মেহরিন বলল,
—“তুমি যে নাস্তা খেতে চাওনি, তবুও আমি দিয়েছিলাম বলে খেয়েছিলে—সেটাও মনে আছে।”
নীল মৃদু হেসে বলল,
—“সব মনে আছে।”
মেহরিন এবার চোখের পানি মুছে বলল,
—“তাহলে বুঝতেই পারছো, তোমাকে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষেও এত সহজ ছিল না।”
কিছুক্ষণ পর তারা দুজন দুই দিকে চলে গেল।
কেউ কাউকে থামাল না।
কারণ তারা দুজনেই জানত—সব ভালোবাসার শেষ একসঙ্গে থাকা নয়।
কিছু ভালোবাসা শুধু মনে থেকে যায়।
একটি পুরোনো চাঁদনী রাত হয়ে।
একটি না বলা কথা হয়ে।
একটি অসমাপ্ত গল্প হয়ে।
আর কখনো কখনো, জীবনের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসাটাই হয় সেই মানুষটির জন্য—যাকে নিজের করে পাওয়া যায়নি।
তবুও মনে হয়,
“যদি আবার কোনোদিন সেই চাঁদনী রাতটা ফিরে আসত, তবে এবার হয়তো তার হাতটা ছেড়ে দিতাম না।”









