Hi

ঢাকা ১২:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুই, জিসান ও রাহুল

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:১০:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২ Time View

ইয়াসমিন আক্তার
জুই আর জিসানের ভালোবাসার শুরুটা ছিল খুব সুন্দর। একে অপরকে ছাড়া তারা যেন কিছুই ভাবতে পারত না। অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা আর ভালোবাসা নিয়ে একসময় তারা বিয়ে করেছিল।
বিয়ের পর প্রথম দিকে তাদের জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। জিসান জুইয়ের ছোট ছোট চাওয়াগুলো বুঝত, তার অভিমান ভাঙাত, পাশে থাকার চেষ্টা করত। জুইও বিশ্বাস করেছিল—এই মানুষটার হাত ধরেই সে সারাজীবন কাটিয়ে দেবে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিসান ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করল।
পরিবর্তনটা একদিনে আসেনি। প্রথমে জুই লক্ষ্য করল, জিসান আগের মতো তার সঙ্গে কথা বলে না। তারপর তার কথাগুলো গুরুত্ব না দেওয়া, ছোট বিষয়েও বিরক্ত হওয়া, প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা—সবকিছু ধীরে ধীরে জুইয়ের চোখে পড়তে লাগল।
জুই প্রথমে ভাবত, হয়তো সংসারের চাপ। হয়তো কোনো সমস্যা চলছে। তাই সে চুপ করে থাকত, নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত।
কিন্তু একসময় সে বুঝতে পারল—জিসান শুধু ব্যস্ত নয়, সে সত্যিই বদলে গেছে।
যে মানুষটির কাছে জুই একসময় নিজের সব কথা বলত, সেই মানুষটির কাছেই নিজের কষ্টের কথা বলতে একসময় তার ভয় লাগতে শুরু করল।
অনেক রাত জুই একা বসে ভাবত,
“আমি কি সত্যিই এতটা বদলে গেছি, নাকি জিসানের চোখেই আমার মূল্যটা কমে গেছে?”
কোনো উত্তর সে পেত না।
ধীরে ধীরে জুই বুঝতে পারল, শুধু ভালোবাসা দিয়ে একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। দুজনের সম্মান, যত্ন আর পাশে থাকার ইচ্ছাটাও দরকার।
তাই একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল—জিসান পাশে থাকুক বা না থাকুক, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
শুরুটা সহজ ছিল না। অনেক কষ্ট, অনেক বাধা আর অনেক কান্নার মধ্য দিয়ে জুই নিজের জীবনটাকে নতুন করে সাজাতে শুরু করল। নিজের কাজ শুরু করল, নিজের পরিচয় তৈরি করল এবং ধীরে ধীরে নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেল।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জুই নিজেকেই বলল,
“আমি পারব। এতদিন শুধু নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারিনি।”
সেদিন থেকেই জুই আর আগের সেই জুই রইল না।
সে বুঝে গেল—কাউকে ভালোবাসা মানে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা নয়।
সময় পেরিয়ে গেল।
জুইকে হারানোর পর একসময় জিসানও বুঝতে শুরু করল, সে আসলে কত বড় ভুল করেছে। জুই তার জীবনে থাকাকালীন তার মূল্য সে বুঝতে পারেনি। কিন্তু জুই চলে যাওয়ার পর তার শূন্যতাটা প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।
জিসান বুঝতে পারল—জুইকে ছাড়া সে ভালো নেই।
সে আবার জুইয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সে জানত না, এরই মধ্যে জুইয়ের জীবনে এসে গেছে রাহুল।
রাহুল জুইয়ের অতীত জানত। তার কষ্ট জানত। কিন্তু কখনো সেই অতীত নিয়ে তাকে বিচার করেনি। বরং জুইয়ের নীরবতাকে বুঝেছে, তার কষ্টকে সম্মান করেছে।
একদিন জিসান জুইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল।
আর তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রাহুল।
দুজন মুখোমুখি।
জিসানের চোখে তখন আফসোস। আর রাহুলের চোখে ছিল জুইকে সম্মান করে পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
জিসান সেদিন প্রথমবার সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারল—ভালোবাসা কী।
সে বুঝল, জুইকে নিজের করে পাওয়ার সময় সে তার মূল্য বুঝতে পারেনি। আর রাহুল জুইয়ের মূল্য বুঝেই তাকে ভালোবাসতে শিখেছে।
জিসান চুপ করে রইল।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, শুধু ফিরে আসতে চাইলেই সবকিছু আগের মতো হয়ে যায় না।
রাহুল ধীরে জুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার অতীত আমি বদলাতে পারব না। কিন্তু তোমার আগামী দিনগুলো যেন সুন্দর হয়, সেই চেষ্টা আমি করতে পারি।”
জুইয়ের চোখ ভিজে উঠল।
আর জিসান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
সেদিন সে বুঝল—
ভালোবাসা শুধু কাউকে কাছে পাওয়ার নাম নয়। ভালোবাসা হলো, মানুষটাকে কাছে পাওয়ার পরও প্রতিদিন তার মূল্য বুঝতে পারা।
জিসান জুইকে ভালোবেসেছিল—এটা মিথ্যা ছিল না। কিন্তু সে সেই ভালোবাসার যত্ন নিতে পারেনি।
আর রাহুল হয়তো জুইয়ের জীবনে পরে এসেছিল, কিন্তু সে জুইকে বুঝেছিল মন থেকে।
জুই সেদিন কোনো উত্তর দিল না।
শুধু রাহুলের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর সেই নীরব দৃষ্টিতেই যেন তার জীবনের নতুন গল্পের উত্তরটা লেখা হয়ে গেল।
কিছু মানুষ আমাদের ভালোবাসতে শেখায়, আর কিছু মানুষ শেখায়—সত্যিকারের ভালোবাসা কাকে বলে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

জুই, জিসান ও রাহুল

Update Time : ১০:১০:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইয়াসমিন আক্তার
জুই আর জিসানের ভালোবাসার শুরুটা ছিল খুব সুন্দর। একে অপরকে ছাড়া তারা যেন কিছুই ভাবতে পারত না। অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা আর ভালোবাসা নিয়ে একসময় তারা বিয়ে করেছিল।
বিয়ের পর প্রথম দিকে তাদের জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। জিসান জুইয়ের ছোট ছোট চাওয়াগুলো বুঝত, তার অভিমান ভাঙাত, পাশে থাকার চেষ্টা করত। জুইও বিশ্বাস করেছিল—এই মানুষটার হাত ধরেই সে সারাজীবন কাটিয়ে দেবে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিসান ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করল।
পরিবর্তনটা একদিনে আসেনি। প্রথমে জুই লক্ষ্য করল, জিসান আগের মতো তার সঙ্গে কথা বলে না। তারপর তার কথাগুলো গুরুত্ব না দেওয়া, ছোট বিষয়েও বিরক্ত হওয়া, প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা—সবকিছু ধীরে ধীরে জুইয়ের চোখে পড়তে লাগল।
জুই প্রথমে ভাবত, হয়তো সংসারের চাপ। হয়তো কোনো সমস্যা চলছে। তাই সে চুপ করে থাকত, নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত।
কিন্তু একসময় সে বুঝতে পারল—জিসান শুধু ব্যস্ত নয়, সে সত্যিই বদলে গেছে।
যে মানুষটির কাছে জুই একসময় নিজের সব কথা বলত, সেই মানুষটির কাছেই নিজের কষ্টের কথা বলতে একসময় তার ভয় লাগতে শুরু করল।
অনেক রাত জুই একা বসে ভাবত,
“আমি কি সত্যিই এতটা বদলে গেছি, নাকি জিসানের চোখেই আমার মূল্যটা কমে গেছে?”
কোনো উত্তর সে পেত না।
ধীরে ধীরে জুই বুঝতে পারল, শুধু ভালোবাসা দিয়ে একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। দুজনের সম্মান, যত্ন আর পাশে থাকার ইচ্ছাটাও দরকার।
তাই একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল—জিসান পাশে থাকুক বা না থাকুক, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
শুরুটা সহজ ছিল না। অনেক কষ্ট, অনেক বাধা আর অনেক কান্নার মধ্য দিয়ে জুই নিজের জীবনটাকে নতুন করে সাজাতে শুরু করল। নিজের কাজ শুরু করল, নিজের পরিচয় তৈরি করল এবং ধীরে ধীরে নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেল।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জুই নিজেকেই বলল,
“আমি পারব। এতদিন শুধু নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারিনি।”
সেদিন থেকেই জুই আর আগের সেই জুই রইল না।
সে বুঝে গেল—কাউকে ভালোবাসা মানে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা নয়।
সময় পেরিয়ে গেল।
জুইকে হারানোর পর একসময় জিসানও বুঝতে শুরু করল, সে আসলে কত বড় ভুল করেছে। জুই তার জীবনে থাকাকালীন তার মূল্য সে বুঝতে পারেনি। কিন্তু জুই চলে যাওয়ার পর তার শূন্যতাটা প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।
জিসান বুঝতে পারল—জুইকে ছাড়া সে ভালো নেই।
সে আবার জুইয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সে জানত না, এরই মধ্যে জুইয়ের জীবনে এসে গেছে রাহুল।
রাহুল জুইয়ের অতীত জানত। তার কষ্ট জানত। কিন্তু কখনো সেই অতীত নিয়ে তাকে বিচার করেনি। বরং জুইয়ের নীরবতাকে বুঝেছে, তার কষ্টকে সম্মান করেছে।
একদিন জিসান জুইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল।
আর তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রাহুল।
দুজন মুখোমুখি।
জিসানের চোখে তখন আফসোস। আর রাহুলের চোখে ছিল জুইকে সম্মান করে পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
জিসান সেদিন প্রথমবার সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারল—ভালোবাসা কী।
সে বুঝল, জুইকে নিজের করে পাওয়ার সময় সে তার মূল্য বুঝতে পারেনি। আর রাহুল জুইয়ের মূল্য বুঝেই তাকে ভালোবাসতে শিখেছে।
জিসান চুপ করে রইল।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, শুধু ফিরে আসতে চাইলেই সবকিছু আগের মতো হয়ে যায় না।
রাহুল ধীরে জুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার অতীত আমি বদলাতে পারব না। কিন্তু তোমার আগামী দিনগুলো যেন সুন্দর হয়, সেই চেষ্টা আমি করতে পারি।”
জুইয়ের চোখ ভিজে উঠল।
আর জিসান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
সেদিন সে বুঝল—
ভালোবাসা শুধু কাউকে কাছে পাওয়ার নাম নয়। ভালোবাসা হলো, মানুষটাকে কাছে পাওয়ার পরও প্রতিদিন তার মূল্য বুঝতে পারা।
জিসান জুইকে ভালোবেসেছিল—এটা মিথ্যা ছিল না। কিন্তু সে সেই ভালোবাসার যত্ন নিতে পারেনি।
আর রাহুল হয়তো জুইয়ের জীবনে পরে এসেছিল, কিন্তু সে জুইকে বুঝেছিল মন থেকে।
জুই সেদিন কোনো উত্তর দিল না।
শুধু রাহুলের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর সেই নীরব দৃষ্টিতেই যেন তার জীবনের নতুন গল্পের উত্তরটা লেখা হয়ে গেল।
কিছু মানুষ আমাদের ভালোবাসতে শেখায়, আর কিছু মানুষ শেখায়—সত্যিকারের ভালোবাসা কাকে বলে।