নতুন তিশা
-
Reporter Name - Update Time : ০৪:০৪:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ৫ Time View

ইয়াসমিন আক্তার
তিশা মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মেধাবী ছিল। পড়াশোনার প্রতি তার অসম্ভব আগ্রহ। কলেজজীবন শেষ করে তার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, অনার্স করবে, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করবে। সে বিশ্বাস করত—একদিন নিজের যোগ্যতায় এমন একটা জায়গায় দাঁড়াবে, যেখানে তার বাবা-মা তাকে নিয়ে গর্ব করবেন।
কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের স্বপ্নের মতো হয় না।
কলেজ শেষ করার পরপরই আবিরের সঙ্গে তিশার বিয়ে হয়ে গেল।
আবিরও ছিল উচ্চশিক্ষিত। তাই তিশা মনে মনে ভেবেছিল,
“হয়তো আমার স্বপ্নগুলো এবার আরও সুন্দর হবে। যে মানুষটি নিজেও পড়াশোনা করেছে, সে নিশ্চয়ই আমার স্বপ্নটা বুঝবে।”
বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা দিন সত্যিই সুন্দর ছিল। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন সম্পর্ক—সবকিছু তিশার কাছে অচেনা হলেও সে মন দিয়ে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
সে ভাবত,
“এই সংসারটাই এখন আমার। ভালোবাসা দিয়ে সাজালে নিশ্চয়ই একদিন সবাই আমাকে আপন করে নেবে।”
কিন্তু ধীরে ধীরে তিশা বুঝতে শুরু করল, এই সংসারে তার পরিচয় যেন শুধু একজন বউ।
আরও খারাপভাবে বললে—একজন কাজের মানুষ।
সকাল শুরু হতো সবার আগে উঠে।
রান্না, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, সবার খাবারের ব্যবস্থা, পরিবারের ছোট-বড় সবার দেখাশোনা—কাজের যেন কোনো শেষ ছিল না।
একটু বসতে গেলেই প্রশ্ন আসত,
— “এখন আবার বসে আছ কেন?”
সারাদিন কাজ করে বিকেলে ক্লান্ত শরীরটা যখন একটু বিছানায় রাখত, তখনও শুনতে হতো,
— “সারাদিন তো শুয়ে-বসে থাকো!”
তিশা চুপ করে থাকত।
কারণ সে জানত, নিজের কষ্টের কথা বললে কেউ তার কষ্ট বুঝবে না।
একদিন খুব সাহস করে আবিরকে বলেছিল,
— “আবির, আমারও তো কিছু ইচ্ছা আছে। আমি আবার পড়াশোনা করতে চাই। নিজের জন্য কিছু করতে চাই।”
আবির খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছিল,
— “এসব নিয়ে এখন ভাবার দরকার নেই। সংসারটাই আগে।”
তিশা আর কিছু বলেনি।
সেদিন রাতে একা ঘরে শুয়ে অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখের কোণে পানি জমেছিল।
সে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিল,
“সংসার কি শুধু আমার দায়িত্ব? আমার নিজের কোনো জীবন নেই?”
দিন যেতে লাগল।
আবিরের বোনেরা, আত্মীয়স্বজন—সংসারের নানা বিষয়ে কথা বলত। তিশার কোনো মতামত থাকলে সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না।
কখনো প্রতিবাদ করলে শুনতে হতো,
— “এই সংসারে থাকতে হলে সবাইকে মানিয়ে চলতে হবে।”
কখনো আরও কঠিন কথা,
— “এভাবে থাকতে না পারলে চলে যাও।”
প্রতিবার কথাগুলো তিশার বুকের ভেতর একটা করে দাগ কেটে যেত।
তবুও সে সংসারটা ধরে রাখার চেষ্টা করত।
কারণ তিশা সংসার ভাঙতে চায়নি।
সে শুধু চেয়েছিল একটু ভালোবাসা।
একটু সম্মান।
একটু নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ।
আবিরের সঙ্গে দুটো কথা বলার চেষ্টা করলেও কখনো শুনতে হতো,
— “তুমি এত কথা বলো কেন?”
অথচ আবিরের আত্মীয়স্বজন এলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত।
তিশা দূরে বসে থাকত।
তার মনে হতো,
“আমি কি সত্যিই এতটাই অপ্রয়োজনীয়?”
ধীরে ধীরে সে কথা বলা ভুলে গেল।
হাসতে ভুলে গেল।
নিজের পছন্দ-অপছন্দ ভুলে গেল।
এমনকি একসময় সে ভুলে গেল—তিশা নামের এই মেয়েটারও একদিন অনেক স্বপ্ন ছিল।
তারপর একদিন বাবার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ এলো।
সেই যাওয়াটাই যেন তিশার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সে চুপিচুপি কলেজে গেল।
আবার অনার্সে ভর্তি হলো।
ফেরার পথে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা আনন্দ হচ্ছিল।
অনেক বছর পর মনে হলো,
“আমি আবার আমার কাছে ফিরে যাচ্ছি।”
সে শিক্ষকদের সঙ্গে নিজের সমস্যার কথা শেয়ার করল। অনলাইন ক্লাসের ভিডিও সংগ্রহ করতে লাগল। সংসারের কাজ শেষ করে রাত জেগে পড়তে লাগল।
ঘুমে চোখ জ্বলত।
শরীর ক্লান্ত থাকত।
তবুও বই খুললেই তার মনে হতো—
“এটাই আমার নিজের জায়গা।”
এর পাশাপাশি সে ফ্রিল্যান্সিং শেখা শুরু করল।
তার হাতে ছিল শুধু একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন।
সেই ছোট্ট ফোনটাকেই সে নিজের নতুন জীবনের দরজা বানিয়ে ফেলল।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে শিখত।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে শিখত।
কখনো ভুল করত, কখনো বুঝতে পারত না, কখনো হতাশ হয়ে ফোনটা পাশে রেখে কাঁদত।
তারপর আবার নিজেকেই বলত,
“না, আমি পারব।”
এভাবে কেটে গেল প্রায় দুই বছর।
তিশার তখনও বড় কোনো পরিচয় তৈরি হয়নি। কিন্তু সে বদলে গিয়েছিল।
আগের মতো কারও কথায় ভেঙে পড়ত না।
একদিন আবিরকে বলল,
— “আমি ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে কাজ করতে চাই।”
আবির প্রচণ্ড রেগে গেল।
অনেক কথা শোনানোর পর বলল,
— “যদি এতই যেতে চাও, তাহলে একবারের জন্যই যাও।”
তিশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
— “তুমি কি সত্যিই আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ?”
কোনো উত্তর না পেয়ে সে বুঝে গেল—যে মানুষটার জন্য সে এত বছর নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে, সেই মানুষটার কাছে তার স্বপ্নের কোনো মূল্য নেই।
তিশা সেদিন কাঁদেনি।
শুধু মনে মনে বলেছিল,
“আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি, আবির। আমি শুধু চেয়েছিলাম তোমার পাশে থেকে নিজের একটা জীবনও বাঁচতে।”
এরপর তিশা নিজের পথে হাঁটতে শুরু করল।
একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজের সুযোগ পেল। নিজের দক্ষতা বাড়াতে লাগল। কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলো।
একদিন একজন বিদেশি ব্যক্তির সঙ্গে কাজের বিষয়ে কথা বলেছিল তিশা।
ব্যাপারটি কোনোভাবে আবিরের কানে গেল।
আবির আবার ক্ষেপে উঠল।
তিশার পরিবারকে ফোন করে নানা ধরনের হুমকি দিল।
তিশার ভাইকে ডেকে পাঠানো হলো।
সবার সামনে আবির রাগে বলল,
— “আমার ঘরে থেকে, আমার স্ত্রী হয়ে এত কিছু করার সাহস তোমাকে কে দিয়েছে? আমাদের পরিবারের মেয়েরা চাকরি করে না। তোমার এত স্বাধীনতা কে দিয়েছে?”
তিশা এবার মাথা নিচু করল না।
সে শান্তভাবে বলল,
— “তোমার ঘরে আমি শুধু কাজ করার জন্য আসিনি। আমি তোমার স্ত্রী হয়ে এসেছিলাম। তোমার সংসার করতে চেয়েছিলাম। তোমার পরিবারের সবাইকে আপন করতে চেয়েছিলাম।”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— “আমি আমার পড়াশোনা ছেড়েছি। আমার স্বপ্ন ছেড়েছি। নিজের ইচ্ছাগুলো একের পর এক মাটিতে পুঁতে রেখেছি। শুধু ভেবেছি, একদিন তুমি বুঝবে।”
কিছুক্ষণ থেমে তিশা বলল,
— “কিন্তু তুমি কখনো বুঝতে চাওনি।”
আবির তখনও রাগে উত্তেজিত।
শেষ পর্যন্ত সবার সামনে তিন তালাক উচ্চারণ করে বসে।
ঘরটা স্বামীর সংসার ছেড়ে তিশা বাবার বাড়িতে ফিরে এল। বুকভরা কষ্ট ছিল, কিন্তু এবার সে আর ভেঙে পড়তে চাইল না। সে জানত, নিজের জীবনটাকে নতুন করে গড়তে হলে তাকেই শক্ত হতে হবে।
কিছুদিন পর একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজের সুযোগ পেল তিশা। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছুই তার কাছে অচেনা ছিল। তবুও সে নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করতে লাগল।
কোম্পানিতে তার পরিশ্রম, সততা আর দক্ষতা খুব দ্রুত সবার নজরে পড়ল। অল্প সময়ের মধ্যেই কর্তৃপক্ষ তাকে ম্যানেজারের দায়িত্ব দিল।
যে মেয়েটাকে একদিন সংসারে শুধু কাজের মানুষ মনে করা হতো, আজ সেই মেয়েটিই নিজের যোগ্যতায় একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে।
তিশার জীবনে যেন সত্যিই নতুন সকাল এলো।
কিন্তু তার সাফল্যের খবর আবিরের কাছে পৌঁছাতেই আবার শুরু হলো বিরোধিতা। নানা কথা, নানা অভিযোগ—তিশাকে আবারও থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
কিন্তু এবার তিশা আর আগের সেই চুপ করে থাকা মেয়েটি নয়।
সে শুধু মৃদু হেসে বলল,
“একদিন আমার স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছিলে। আজ সেই স্বপ্নই আমার পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তারপর তিশা নিজের পথেই এগিয়ে গেল।
পেছনে পড়ে রইল সেই সংসার, যেখানে সে নিজেকে হারিয়েছিল।
আর সামনে খুলে গেল তার নিজের হাতে গড়া নতুন জীবন।
সেই দিন থেকেই তিশা আর কারও ছায়া নয়—সে নিজেই নিজের পরিচয়।


















