Hi

ঢাকা ০১:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সত্যের মঞ্চ না রাজনৈতিক অঙ্গন? সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সীমারেখা নিয়ে নতুন ভাবনা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:০৩:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
  • ৩ Time View

মোঃ শহিদুল ইসলাম সাংবাদিক ও কলাম লেখক

গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশে সাংবাদিকতা ও রাজনীতি—দুটি শক্তিশালী এবং অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। একদিকে রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার পথ নির্ধারণ করে, অন্যদিকে সাংবাদিকতা সেই পথচলার ওপর জনগণের পক্ষ থেকে নজরদারি নিশ্চিত করে। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে উভয়ের স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তাদের নিজ নিজ ভূমিকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে একজন সাংবাদিক একই সঙ্গে রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত হলে কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্যে যুক্ত হলে তার পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে জনবিশ্বাসের ওপর। পাঠক, দর্শক কিংবা শ্রোতা যখন কোনো সংবাদ গ্রহণ করেন, তখন তারা ধরে নেন যে সংবাদটি বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যনির্ভর এবং পক্ষপাতহীনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয় দৃশ্যমান হয়ে উঠলে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ডে ‘স্বার্থের সংঘাত’কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কারণ বাস্তবে পক্ষপাতহীন থাকলেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। আর গণমাধ্যমে সন্দেহের সৃষ্টি মানেই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বিষয়টি আরও জটিল। স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা, সামাজিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রায়ই একই পরিসরে অবস্থান করে। ফলে কোনো ব্যক্তি হয়তো একই সঙ্গে সাংবাদিক, সংগঠক এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই বহুমাত্রিক পরিচয় শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার পেশাগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।

এটিও সত্য যে রাজনৈতিক পরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা থাকলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবাদিকও নানামুখী চাপ, বিতর্ক কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। তখন তার পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই বেশি আলোচিত হয়।

এ কারণে সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক সীমারেখা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। যারা রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চান, তাদের জন্য রাজনীতির পথ উন্মুক্ত। আবার যারা সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চান, তাদের জন্য রাজনৈতিক পদ-পদবি ও দলীয় সম্পৃক্ততা থেকে দূরে থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি কোনো রাজনৈতিক বলয়ে নয়; তার শক্তি সত্যের প্রতি অঙ্গীকারে, পেশাগত সততায় এবং জনগণের আস্থায়। আর গণমাধ্যমের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—আস্থা অর্জন করতে লাগে বহু বছর, কিন্তু তা হারাতে যথেষ্ট একটি ভুল সিদ্ধান্তই।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

ঈদ-গ্রীষ্মের ছুটি শেষে খুলছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

সত্যের মঞ্চ না রাজনৈতিক অঙ্গন? সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সীমারেখা নিয়ে নতুন ভাবনা

Update Time : ০৮:০৩:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

মোঃ শহিদুল ইসলাম সাংবাদিক ও কলাম লেখক

গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশে সাংবাদিকতা ও রাজনীতি—দুটি শক্তিশালী এবং অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। একদিকে রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার পথ নির্ধারণ করে, অন্যদিকে সাংবাদিকতা সেই পথচলার ওপর জনগণের পক্ষ থেকে নজরদারি নিশ্চিত করে। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে উভয়ের স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তাদের নিজ নিজ ভূমিকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে একজন সাংবাদিক একই সঙ্গে রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত হলে কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্যে যুক্ত হলে তার পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে জনবিশ্বাসের ওপর। পাঠক, দর্শক কিংবা শ্রোতা যখন কোনো সংবাদ গ্রহণ করেন, তখন তারা ধরে নেন যে সংবাদটি বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যনির্ভর এবং পক্ষপাতহীনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয় দৃশ্যমান হয়ে উঠলে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ডে ‘স্বার্থের সংঘাত’কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কারণ বাস্তবে পক্ষপাতহীন থাকলেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। আর গণমাধ্যমে সন্দেহের সৃষ্টি মানেই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বিষয়টি আরও জটিল। স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা, সামাজিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রায়ই একই পরিসরে অবস্থান করে। ফলে কোনো ব্যক্তি হয়তো একই সঙ্গে সাংবাদিক, সংগঠক এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই বহুমাত্রিক পরিচয় শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার পেশাগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।

এটিও সত্য যে রাজনৈতিক পরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা থাকলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবাদিকও নানামুখী চাপ, বিতর্ক কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। তখন তার পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই বেশি আলোচিত হয়।

এ কারণে সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক সীমারেখা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। যারা রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চান, তাদের জন্য রাজনীতির পথ উন্মুক্ত। আবার যারা সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চান, তাদের জন্য রাজনৈতিক পদ-পদবি ও দলীয় সম্পৃক্ততা থেকে দূরে থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি কোনো রাজনৈতিক বলয়ে নয়; তার শক্তি সত্যের প্রতি অঙ্গীকারে, পেশাগত সততায় এবং জনগণের আস্থায়। আর গণমাধ্যমের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—আস্থা অর্জন করতে লাগে বহু বছর, কিন্তু তা হারাতে যথেষ্ট একটি ভুল সিদ্ধান্তই।